সেলফি-ই আত্মপ্রেম

মীর আখতার হোসেন নজরুল। নিজের প্রতিকৃতির ছবি তোলাকে অক্সফোর্ড অভিধানের বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে নির্বাচিত করেছে সেলফি প্রতিশব্দটি। অভিধানটির সম্পাদকদের রেফারেন্সে বিবিসি জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও নিজের ছবি তোলার ক্ষেত্রে যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহৃত হয় তা থেকেই ‘সেলফি’ শব্দটির উৎপত্তি।

আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) সাম্প্রতিক মানসিক ব্যাধির সঙ্গে সেলফি তোলার সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শিকাগোতে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিচালনা পর্ষদের সভায় সেলফির সঙ্গে মানসিক ব্যাধির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। গবেষকেরা দাবি করেছেন, অতিরিক্ত নিজের ছবি তোলার প্রবণতা এবং সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে দেয়ার এই মানসিক সমস্যার নাম ‘সেফিটিস’।

গবেষকরা জানিয়েছেন, সেলফি অবস্থান যখন ব্যাধি পর্যায়ে যাবে তখন ব্যধিটির তিনটি স্তর হতে পারে। প্রথম স্তরটি ‘বর্ডার লাইন সেলফিটিস’। মানুসিক সমস্যার এই পর্যায়ে দিনে তিনবার নিজের ছবি তোলে কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের সাইটে তা পোস্ট না করা। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে ‘অ্যাকিউট সেলফিটিস’। এই পর্যায়ে দিনে অন্তত তিনটি নিজের সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগের ওয়বসাইটে তিনটি সেলফিই পোস্ট করা হয়। শেষ স্তরটি হচ্ছে ‘ক্রনিক সেফিটিস’। এ পর্যায়ে নিজের সেলফি তোলা রোধ করা যায় না। দিনে অন্তত ছয়বার সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগের সাইটে পোস্ট করতে দেখা যায়। এ ছাড়া বারবার নিজের ছবি তোলার প্রবণতা থাকে। ক্রনিক সেলফিটিস পর্যায়ে।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের পথপ্রদর্শক ফ্রএড বহু আগেই বলেছেন, শিশু জন্মের সাথে সাথে আত্মকামী (narcissist) হয়ে জন্মগ্রহণ করে। অর্থাৎ সে আত্মসুখসর্বস্ব হয়; নিজের সুখ ছাড়া আর কিছুই সে বুঝতে চায় না। পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারনা যতো কম-ই হোক, প্রত্যেক শিশুই এই পৃথিবীকে একমাত্র তার নিজের সুখভোগের স্থান হিসেবেই জানে। শিশুকে আত্মকামী বুঝাতে ফ্রএডই সর্বপ্রথম narcissism প্রতিশব্দটি ব্যবহার করেছেন।

অনেকেই হয়তো জানেন, নার্সিসাস ছিলেন গ্রীক পুরানের এক গল্পের নায়ক। এই হ্যান্ডসাম সাহসী যুবক বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শিকারের জন্য জঙ্গলে গিয়েছিলেন। জঙ্গলে সে পথ হারায়ে একা হয়ে পড়েন। একা একা পথ খুঁজতে খুঁজতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্ত যুবক হতাশভাবে চিৎকার করে বলতে থাকে, “কেউ কি এখানে আছে?” পাহাড়ী জঙ্গলে তার চিৎকারের প্রতিধ্বনি হয় “এখানে আছে-এ-এ!” অন্যদিকে ঈর্ষান্বিত ইন্দ্রাণীর অভিশাপে সৃষ্ট প্রতিধ্বনি কায়ধারিণী রূপসী এক তরুণী। মহাদেবীর অভিশাপে ওই রূপসী  তরুণীর জবান বন্ধ হয়ে ছিল। সে শুধু ধ্বনির শেষটুকু উচ্চারণ করে তার জবানকে তৃপ্ত করত। অপূর্ব সুন্দরী প্রতিধ্বনি গভীর জঙ্গলে নার্সিসাসকে দেখা মাত্র তার (নার্সিসাস) প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু নার্সিসাস একমাত্র নিজেকে ছাড়া কোন রমনীকে বা কোন পুরুষকে ভালাবাসতেই জানেনা বা পারে না। নার্সিসাসের পিছু পিছু অনেক ছুটেছিল প্রতিধ্বনি; কিন্তু কোন লাভ হয়নি। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে নার্সিসাসের পিছু ছুটা বাদ দিয়েছিল প্রতিধ্বনি।

শুধু নিজকে নিজে ভালবেসে নার্সিসাস একা একাই জঙ্গলে বসবাস করছিল। সে পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হতো। সময় সময় পানির মধ্যের নিজের প্রতিচ্ছবি ধরতে যেতো; কিন্তু তাতে পানি ঘোলা করা ছাড়া আর কিছুই পেত না নার্সিসাস-ব্যর্থ হতো। বার বার ব্যর্থ নার্সিসাস; তিলে তিলে নিজকে ক্ষয় করে অবশেষে নিস্ফল জীবনাবসান করেছিলেন। তাঁর রিক্ত জীবনের শেষ কাতরোক্তি ও দীর্ঘস্বাস হয়তো করুণ সুরে শুধু বন-মর্মরের কানে প্রতিধ্বনি হয়ে বেজেছিল। এই হলো গ্রীক পুরানের নার্সিসাসের গল্প।

নার্সিসারের গল্পের কোন বাস্তবাতা আধুনি এই জীবনে পাওয়া যাবে না। তবে রূপক হিসেবে যদি কোন তত্বজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানী অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপলদ্ধি করেন যে, জীবিত নার্সিসাস না থাকলেও নার্সিসাসের সত্ত্বা আমাদের মাঝেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে যে হাজার হাজার বা লাখ লাখ নার্সিসাস আমাদের সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছে তার প্রমান হলো ওই ‘সেলফিটিস’ নামের প্রতিশব্দটি। সেলফিটিসের মতো বিচিত্র-বিকৃত মনের মানুষ এবং সেলফির বাস্তবতা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি মনোরোগ পর্যায়ে।

ফ্রএড মনোবিশ্লেষনে বার বার কাম কথাটার প্রমান পেয়েছেন। আর এ-ও সত্য যে ফ্রএডের কামের একটা বড় অংশ নারী আর পুরুষের কাম হলেও; ফ্রএডের কামের দ্বিতীয় বড় অংশ হলো আত্ম প্রেম বা আত্ম কাম। এই আত্ম প্রেম কখন জীবন যুদ্ধের জটিলতায় পড়ে বা জীবন যুদ্ধের জটিলতার সাথে পরাজিত হয়ে নিজে নিজের মধ্যে ঢুকে পড়ে ‘সেলফিটিস’ হয়ে পড়েছে তা হয়তো এখন অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীরা-ই চিহ্নত করতে পারবেন।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় ‘যাযাবর’ এর ‘দৃষ্টিপাতের’ ভাষায় হুবহু বলতে না পরলেও অন্তত এটুকু বলা যায়, ‘আমরা বেগ পেয়েছি, আবেগ হারিয়েছি।’ আজ অনেকে হয়তো অভাবের অভাবে হতাশ হয়ে সংসার ত্যাগ করছে; বাঁধতে পারছে না পারিবারিক অবস্থান। আবার মৌলিক অধিকারের প্রথম যে শব্দটি-খাদ্য, সেই খাবারের অভাবেও মানুষ টিকিয়ে রাখতে পারছে না পরিবার নামের মহান প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান বিশ্বের এই যে জটিল অবস্থা, এর থেকে বহু মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজ বিজ্ঞানী থেকে আরাম্ভ করে অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীদের দরদি মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ‘সেলফিটিস’ নামের এই ব্যাপারটি জটিল এবং দুরারগ্য মনোব্যধি না হলেও তাদের ছিটগ্রস্ততা বা মুদ্রাদোষ দুর করতে মনোবীক্ষণ (psycho-analysis) করে বুঝতে হবে ‘সেলফিটিস’ হওয়ার পিছনে মূল কারণ কোনটি। মনোরোগের কারণ চিহ্নিত করতে পারলেই ওই রোগ থেকে আরগ্য করে তোলা যায়।

এপ্রিল ১৫, ২০১৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *