সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফের বাতিলের ইঙ্গিত | sampadona bangla news
মঙ্গলবার , ২২ আগস্ট ২০১৭

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফের বাতিলের ইঙ্গিত

সম্পাদনা অনলাইন : আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘বিচারপতিদের অপসারণের ব্যাপারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা সামরিক স্বৈরাচারদের বই থেকে ধার করে আনা হয়েছে। এটি অস্বচ্ছ, অগণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে আমরা পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি।’

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি অত্যন্ত অস্বচ্ছ ও নাজুক।’

ষোড়শ সংশোধনীর ব্যাপারে আপিল বিভাগের রায়ের বিষয়ে সরকার পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এর আগে গতকাল বুধবার সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।

‘সামরিক স্বৈরশাসকদের বই থেকে ধার করা’ : আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনীতে মার্শাল ল’ প্রমালগেশন দ্বারা তৈরি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বাদ দিয়ে ১৯৭২ সালের গণপরিষদ দ্বারা পাসকৃত ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করায় কোথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হলো আমি বুঝতে পারি না।’

আনিসুল হক বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনীর আগের ১৯৭২ সালের সংবিধানে ৯৬ অনুচ্ছেদ হুবহু ষোড়শ সংশোধনীর মতোই ছিল। সংসদ পঞ্চদশ সংশোধনীতে অনেক বিষয় ১৯৭২ সালের গণপরিষদ দ্বারা জাতির পিতার অংশগ্রহণসহ যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, বহুলাংশে সেই সংবিধানে ফিরে গিয়েছিল। বিচার বিভাগের সম্মান, স্বাধীনতা এবং বিচারক অপসারণের ব্যাপারে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার অভিপ্রায় নিয়ে এই সংশোধনী আনা হয়েছিল এবং তা জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিল।’

আনিসুল হক বলেন, ‘সফল গণতন্ত্রে যেসব নীতি অনুসরণ করা হয় সেগুলোকে যদি উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়, তাহলে যুক্তি আরো শক্ত হয়। অন্যদিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি শুধু মিলিটারি ডিক্টেটরদের বই থেকেই প্রাপ্ত। এটা ১৯৬২ সালের আইযুব খানের সংবিধানে ছিল। তাই এটা গণতন্ত্রের সঙ্গে কিছুতেই খাপ খায় না।’

‘আপিল বিভাগের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়’ : আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আপিল বিভাগ যে যুক্তিতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করেছেন, সেই সব যুক্তি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। শেখ হাসিনা সরকার এবং জাতীয় সংসদের কোনোদিনই এই অভিপ্রায় ছিল না যে, কোনো সংশোধনী দ্বারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ বা খর্ব করা হবে।’

আনিসুল হক আরো বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরো সুদৃঢ় এবং স্বচ্ছ হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমরা গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করার গণতন্ত্রের মৌলিক মন্ত্র চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ষোড়শ সংশোধনী পাস করি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ শে জানুয়ারি পর্যন্ত গণপরিষদ দ্বারা পাসকৃত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারককে অপসারণ করা হয় নাই। কিন্তু ১৯৭৭ সালের সামরিক শাসন দ্বারা সংশোধিত ৯৬ অনুচ্ছেদে থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্টের অনেক বিচারককে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে না নিয়েও চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে।’

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফের বাতিলের ইঙ্গিত : পুনরায় এ ব্যবস্থা বাতিলের ইঙ্গিত দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং নাজুক। তাই এর পরিবর্তনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের স্বাধীনতা এবং তাঁদের চাকরির নিশ্চয়তা রক্ষা করা হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা সংসদ বিচার বিভাগের সঙ্গে কোনো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয় নাই। বরঞ্চ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টাই করেছে।’

তিনি বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৯৬ অনুচ্ছেদকে পরিবর্তন করা হয় নাই বলেই আর কখনো ৯৬ অনুচ্ছেদকে সংশোধন করা যাবে না এ রকম কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা কোথাও নাই। আমরা যেহেতু এই রায়ে সংক্ষুব্ধ তাই আমরা নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করছি যে এই রায়ের রিভিউ করা হবে কি না? আমরা এখনো কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হই নাই। কারণ রায়ের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখনো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’

‘একপাঞ্জ-এর আবেদন করা হবে’ : আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা যেটা এই মামলার সঙ্গে একদমই সম্পর্কিত না- সে রকম বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জাতীয় সংসদ সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানকে হেয়প্রতিপন্ন করেছেন। ওই সকল রাজনৈতিক প্রশ্ন আদালত কর্তৃক বিচার্য বিষয় হতে পারে না।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাঁর এই বক্তব্যে দুঃখিত। তিনি রায়ের আরেক জায়গায় উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির কারণে হয় নাই। আমি তাঁর এই বক্তব্যে মর্মাহত। আমরা স্মরণ করতে চাই যে ইতিহাস বলে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে আন্দোলনগুলো হয়েছে, তারই ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধু হয়তো পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন কিন্তু তাঁরই নেতৃত্বে তাঁরই আদর্শে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল।’

আনিসুল হক বলেন, ‘এটা ভুললে চলবে না যে, জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ছাড়া এ দেশের আর কেউ ১৩ বছরের অধিক কারাভোগ করেন নাই। তাই মাননীয় প্রধান বিচারপতি এই বক্তব্য আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ইতিহাস এ কথাও বলে যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ জনগণের দেওয়া ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।’

‘রায় বিদ্বেষতাড়িত’ : আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি মামলার বাইরে গিয়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থী বলে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তাতে আমরা বিস্মিত হয়েছি। আমরা ধন্যবাদ জানাই সেই চারজন বিচারপতিকে যাঁরা তাঁর ওই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আর শুধু এটুকু বলতে চাই যে এই ১১৬ অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থী আখ্যায়িত করার আমার মনে হয় মাননীয় প্রধান বিচারপতির যে রায় তা যুক্তিতাড়িত নয় বরং আবেগ ও বিদ্বেষতাড়িত। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে প্রধান বিচারপতির আসন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং যে কোনো ব্যক্তির সেই আসন অলংকৃত করলে তাঁকেও আমরা সেই প্রতিষ্ঠানের সাথে এক করে ফেলি। তাই আমাদের সকলের দায়িত্ব এই প্রাতিষ্ঠানিক আসনটির মর্যাদা রক্ষা করা।’

‘বিচার বিভাগ ও সরকার মুখোমুখি নয়’ : এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার ও বিচার বিভাগ এখন মুখোমুখি অবস্থায় নয়। সরকার স্বাধীন বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাসী। বিচার বিভাগের কোনো কাজে সরকার হস্তক্ষেপ করতে চায় না।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘বিএনপির মুখে গণতন্ত্র ও আদালত এবং বিচার বিভাগ নিয়ে কোনো কথা শোভা পায় না। তারা মামলা থেকে নিজেদের বাঁচাতে আদালতকে অবজ্ঞা করে বিদেশে চলে যায়।’

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someone

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*