সম্পাদনা অনলাইন : ইদানীং সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু পড়ছেন। বড় কিছু লিখছেন না কেন? পড়ার মধ্যে লেখার ভাবনা আছে। ভাবনার মধ্যে নানা সূচিমুখ তৈরি হচ্ছে। কোনও লেখা মাথায় এলেই আগেই মনে আসে, না। থাক! এ নিয়ে তো অনেক লেখা হয়েছে। আসলে এখন তো পড়া কম! এটা মেনে নিতেই হবে।

কেন পড়া কম? লেখকদের দায় নেই?

আমি মনে করি, যে সময়ের মধ্যে আছি তার মধ্যে একটা চিরন্তনের কোশেন্ট আছে, মানে বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিকের কথা বলতে চাইছি আমি। প্রতি চলমান সময়ের মধ্যে চিরকালীন কথা বলা আধুনিকতার শরীরে। আজকের লেখকের মধ্যে সেই চিরন্তনের কোশেন্ট কোথায়? বরং সামান্য মূল্যবোধের জায়গা থেকে খুব দ্রুত ফরমায়েসি লেখা হচ্ছে।

এ রকম শোনা যায়, এক লেখককে বলা হয়েছে রেপের গল্প লিখুন, রেপ এখন চলছে। এ ভাবে গল্প হয়?

নাহ্, এ ভাবে কিচ্ছু হয় না। তবে যে প্রসঙ্গ নিয়ে, মানে না-পড়া নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, সেখানে পাঠকের বড় ভূমিকা আছে। সাহিত্য এসেছে আত্মপ্রকাশ থেকে। সবাই তো লেখে না, তাই পড়ে। কিন্তু এই সময় পুরো বদলে গেছে। মানুষ যা ভাবছে, যা সাজছে, যা দুঃখ পাচ্ছে সেটা শুধু প্রকাশ করছে তা নয়, আর দশ জনের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। ফলে লেখকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাই তো আর তার নেই! এক জন মানুষ পোডিয়ামে দাঁড়াবে, তাঁর কথা হা করে শুনব! এই জায়গাটা আর তো নেই! গল্প, উপন্যাস পড়ে আর মানুষ জীবনকে ভরাতে চায় না, এটা মেনে নেওয়াই ভাল!

আরও পড়ুন :বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাই পাল্টে দিয়েছেন এই বলি তারকারা

আজ এই মুহূর্তে ‘এই মানুষটার’ কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে…নাহ্…এ রকম কেউ বোধ হয় নেই।অকপট সঙ্গীতা। ছবি ফেসবুকের স‌ৌজন্যে।

ফেসবুকে এত বাংলা লেখা হচ্ছে, ভুরি ভুরি ভার্চুয়াল লেখক! আপনি কী বলবেন?

লেখক? লেখক হতে গেলে একটা কমিটমেন্ট লাগে, ধরা যাক আমি একটা উপন্যাস লিখছি, দশ বছরের সময় ঘিরে। তো সেই দশ বছরের ধারা, তখনকার সমস্ত কিছু, এমনকি, সে সময় কী বিজ্ঞাপন ছিল সেটাও আমায় জানতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হবে। শুধুমাত্র লেখার কাছে থাকতে হবে। এই কমিটমেন্ট কোথায় এখন? আত্মত্যাগ কই এদের? নিজেকে সময় দিতেই ব্যস্ত! ফেসবুকের ওই লেখকদের কমিটমেন্ট দেখাতে বললে সব ঝরে যাবে! চার লক্ষ শব্দ লেখার ক্ষমতা আছে এদের? হয়তো দেখব কয়েকটা টিকে থাকবে!

এত যদি আত্মপ্রকাশের তৃপ্তি হয় তা হলে এই সময়ের এত হতাশা কেন?

দু’ধারার মানুষ হয়েছে এখন। এক জন নিজেকে মেলে ধরে আমি ইন্টেলেকচুয়াল, দুর্ধর্ষরিডার, বোদ্ধা। আর এক দল বলে, দেখ, আমি কী দারুণ আছি! বাবার জন্মদিন, বিদেশ যাওয়া, বিয়ের তারিখে ফাইভ স্টারে, দেখ কোনও দুঃখ নেই আমার, কী ভীষণ ভাল আছি! আমি ভাল মা বা বর, ইত্যাদি।

বেশ, একটু প্রসঙ্গ ফেরাই। লেখক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই সোজা সোজা কথা আর বিতর্ক। কেন?

ধরুন একটা কিছু ঘটছে, আমার সেখানে ঢোকা ঠিক না। বিপদ হবে জেনেও আমি পালাতে পারব না। ঠিক একই ভাবে আমি লেখার সময় দু’জন নারী-পুরুষের গভীর সম্পর্ক নিয়ে লিখছি, সেখানে যৌনতা আসবেই তো। ছেলে-মেয়ে কাছে এলে কি আমি আলো নিভিয়ে দেব? কেন? আমি যে উপুড় হয়ে সাদা পাতার সঙ্গে এই শব্দবন্ধন গড়ে তুলছি সেখানে থেমে তো যাবই না! বরং তার তলানি অবধি যাব। যে যা-ই বলুক! যৌনতা কিন্তু অনেক কিছুকে রুল করে, আবার নিজেও এক্সপ্লয়েটেড হয়! মানুষের পরিণতি বদলায় যৌনতার জন্য। এটা আমি লিখব না? কাকে ভয় পাবো?

কিন্তু এক জন মহিলা লেখক বলেই কি ‘প্যান্টি’ নিয়ে আক্রমণ বেশি?

আগে ভাবিনি। হ্যাঁ, হতেই পারে। তবে সারা ক্ষণ সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা প্রসঙ্গে ‘প্যান্টি’ আর ‘শঙ্খিনী’র কথাই কেন ওঠে? যে লেখায় কোনও যৌনতা নেই সেগুলো তো আসে না! আসলে এটা মানুষের ব্যক্তিগত রুচির বিষয়। সে ইচ্ছে করে বদমায়েশি করে। ক্রুক!

আরও পড়ুন : কোনটা মনীষা আর কোনটা নার্গিস বলুন তো?

সত্যি কথা বলুন তো, বাংলা সাহিত্য আজ কি মরে গেছে?

লেখা তো প্রচুর হচ্ছে। আমি শুনেছি বাণী বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তিলোত্তমা মজুমদারের নাম লোকে পর পর বলে। কিন্তু তা-ও বলছি, বাংলা সাহিত্য আজ এই মুহূর্তে ‘এই মানুষটার’ কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে…নাহ্…এ রকম কেউ বোধ হয় নেই। বছর চারেক আগে এক জন উপন্যাস লিখছেন, মুম্বইয়ের এক অভিনেত্রী সে নাকি লুকিয়ে তার বাবা, মাকে নিয়ে ডায়মন্ড হারবারে হোটেলে রেখেছে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য! এই তো বাংলা উপন্যাসের অবস্থা। এক জন লেখকের মধ্যে যে দীনতা লেখায় চলে আসছে। এক্সপোজারের অভাব। এটা সাহিত্য নয়।

ছাপা উপন্যাস খান পনেরো, গল্পের সংখ্যা ৬০। তো এর পর সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করবেন?

আমি রোজ ২০০০ শব্দ লিখতেই পারি। ছাপাও হয়ে যাবে। কিন্তু লিখব না, যত ক্ষণ না আমার প্যাশনের মধ্যে তোলপাড় হবে! মন বলবে এটা লিখতেই হবে তত ক্ষণ লিখব না! আরে লেখক গ্যাপ নিতেই পারে।

বিয়ের খবর জানিয়ে সঙ্গীতা ফেসবুকে শেয়ার করলেন এই ছবি। 

সেই গ্যাপেই কি এই লেখক বিয়ে করেছে?

হ্যাঁ, (হেসে) অক্টোবরে আমি জুয়েলকে বিয়ে করেছি।

সম্পর্ক তো বহু বার ভেঙেছে, গড়েছে…

হ্যাঁ। আঘাত খুব জোরালো ছিল এক এক সময়! তবে সব সম্পর্ক নিজে ভেঙেছি। কাউকে ভাঙার সুযোগ দিইনি। আমি আসলে খুব শক্ত, ছোটবেলায় ভীষণ সিকিওরড ছিলাম, তাই লড়াইটা ভয়ঙ্কর ভাবে করতে পারি আজ! আগে ইমোশনাল ছিলাম, কিন্তু আজ বলতে পারি না অবশ্য যে আমি ইমোশনাল। কীসে নাড়া দেবে আমায়? জানি না! আমার বন্ধু কম। লেখকদের সঙ্গে মিশতেও চাই না। বলুন তো? লেখক বলেই কি অটোওয়ালা, গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশতেই হবে আমায়? এমন নয়।

বিয়ের পরের জীবন কেমন? ছেলে কী বলছে?

ছেলে নিজের মতো করে বড় হয়েছে। আর এখন বিয়ের পর সিকিওরড সম্পর্কে আছি! এখন একাকীত্ব নেই। বেশ আছি। কাচের দেওয়াল ভেঙে রোদ্দুর আরও আলো দেয়…

রেকর্ডার বন্ধ হয়ে যায়।

দেখি, সত্যিকারের সময় কাটাচ্ছেন তিনি। সময় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া জীবন!

যেমন, হঠাৎ গানে পাওয়া, গানের মধ্যে ঘোরা, ইচ্ছে হল জয়দাকে (গোস্বামী) ফোন। কাবেরীদির সঙ্গে সন্ধের সাজুগুজু আর কফি। দূরে কোথাও প্রিয় ঢাকাই শাড়ির গন্ধ ভরা প্রেম!

নাহ্, আর ফিরে তাকানো নেই আলেয়ার পিছে পিছে…