রিয়াকারীর অবস্থা মন্দের প্রভাব-মুক্তি | sampadona bangla news
শুক্রবার , ১৯ অক্টোবর ২০১৮

রিয়াকারীর অবস্থা মন্দের প্রভাব-মুক্তি

মসজিদে নববীসাদী: আল্লাহ আমাদের সকলকে উত্তম তাওফীক দান করুন। ধর্মের পথ যখন পরিস্কার ও সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, তখন আমাদের চেষ্টা-যত্নকে খারাপ থেকে আলাদা রাখা এবং ক্ষতিকর অবস্থা থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। ঈমানকে শক্তভাবে অবলম্বন এবং উদ্দেশ্যকে ভালভাবে স্মরণ করার মধ্যেই তা সম্ভব। এছাড়া আরো দুটো কারণেও মন্দর প্রভাব থেকে আমাদের অভ্যাসকে বা আমলকে রক্ষা করা দরকার। প্রথম কারণ হলো যে অভ্যাস বা আমলের কারণে ফল দেয় অর্থৎ তা যেন আল্লাহর দরবারে যথাযথভাবে গ্রহণযোগ্য হয় এবং তার বদলে পূণ্য পাওয়া যায়। নতুবা যদি পণ্যের অংশ-বিশেষ বা সমগ্র পূণ্যই যদি নিজের কাজে না আসে তবে তা দুর্ভাগ্যজনক। নবী (সাঃ) বলেছেন, আমি মানুষের শিরক থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী (অর্থৎ অদৌ মুখাপেক্ষী নই)। আল্লাহ বলছেন, যে ব্যক্তি তার আমলে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে শরীক করে, তখন তার অর্থ এই যে, সে যেন আমার অংশটিও অপরকে দিয়ে দিল। আমি ততক্ষণ পর্যন্ত অবশ্যই আমাল কবুল করি না, যতক্ষণ না তা আমার জন্যে বা আমার উদ্দেশ্যে হয়।

বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন মানুষ যখন আল্লাহর কাছে তাদের আমলের সওয়াবের জন্য দরখাস্ত পেশ করবে, তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার জন্য কি মসজিদে জায়গা করে দেয়া হয়নি? এমন দেখা যায় অনেকে সম্মান পাওয়া এবং বেশি সওয়াবের জন্য আরেক জনকে সরিয়ে নিজে সামনের কাতারে যায়। উদ্দেশ্য বেশি বেশি পূণ্য হাসিল করা। কিন্তু এই আমল যদি লোক দেখানো হয় তবে মসজিদে জামাতে নামাজ পড়েও আল্লাহর নৈকট্য বা বেহেশত পাওয়া যাবে না। দুনিয়ায় কি তুমি নেতৃত্ব পাওনি, অর্থাৎ আল্লাহ অনেককে ক্ষমতা দিয়েছে নেতৃত্ব দেয়ার; আগের যুগে রাজা বাদশা বানিয়েছে, এযুগে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী বানাচ্ছে কিন্তু তারা সৎভাবে দায়িত্ব পালন করে না। বরং লোক দেখানো ইবাদত করে এবং নিজে ভিতর ভিতর অসৎ হয়েও বাইরে নিজকে সৎ পরহেযগার বলে প্রমান করতে চায়। অর সততার জন্য সকলে তাকে সম্মান করুক এটা চায়। ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে তোমাকে কি সুযোগ-সুবিধা দান করা হয়নি? এটা ব্যবসায়িদের ক্ষেত্রে। যেসব ব্যবসায়ী ক্রয় বিক্রয়ের সুযোগে অপরের হক বঞ্চতি করে অথচ নিজেকে ধার্মিক দাবী করে। অথচ নিজ কার্যকলাপের জন্য সম্মান ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়? অনেকেই নানা রকম ফন্দি ফিকির করে লাভবান হতে চায়। মোটকাথা, আমলে এমন সব খারাপ জিনিস মিশে থাকতে পারে যা শুধু ক্ষতিকারকই নয়-আমলকে ধ্বংস করে দিতেও পারে যেমন রিয়া-অর্থাৎ লোক দেখানো ইবাদত। কুরআনে আল্লাহ বলেছে, কোরবানির রক্ত, মাংশ কিছুই আমার কাছে আসে না। আমি শুধু বান্দার মনের দিকটি বা নিয়ত দেখি। (বাক্যটি হয়তো হুবহু নয়!) অর্থৎ লোক দেখানো কোরবানি আল্লাহ পছন্দ করেন না। বর্তমান যুগেতো মানুষ নাম কেনার জন্য প্রতিযোগীতা করে বড় বা বেশি টাকা দিয়ে গরু কিনে কোরবানি দিয়ে থাকে।

রিয়ার অনিষ্টকারিতা: রিয়ার জন্য দুই ধরনের অসম্মান ও বিপদে পড়তে হয় পথমত সব ফেরেশতার সামনে নিজের দোষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। কারণ। ফেরেশতারা বান্দার আমল (রিয়া-মিশ্রিত) সানন্দ-চিত্তে আল্লাহর দরবারে নিয়ে হাজির হলে আল্লাহ নির্দেশ দান করেন, এই আমল ‘সিজ্জীনবাসীদের’ স্থানে রেখে দাও। কারণ, এই আমল আমার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। মানুষকে দেখানর জন্য এই আমল বা ইবাদত করা হয়েছে। দুনিয়াতে মানুষ যখন বলত লোকটি খুব পরহেযগার আর তা শুনে গর্বে মাথা উচু হয়ে যেত। পরহেজগার হিসেবে কারো কারো কাছ থেকে সুযোগ সুবিধা ও নিতো। তাই ফেরেশতাদের সামনে একদিকে যেমন বান্দার, অপরদিকে তেমনি সেই আমলের তুচ্ছতা ও হীনা প্রতিপন্ন হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, প্রকাশ্যভাবে: আর একবার অসম্মানী ঘটবে কিয়ামতের দিন যেমন নাবী (সাঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন রিয়াকারীকে চারটি নামে ডাকা হবে-ওহে কাফির! ওহে ফাজিল! ওহে দাগাবাজ! এবং ওহে অনিষ্টকারী! তোর চেষ্টা-যত্ন ভন্ডুল হয়ে গেছে-তোর সওয়াব বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। আর তোর জন্য কিছুই নেই। হে ধোঁকাবাজ, তুই যার জন্য আমল করতিস, তার কাছ থেকেই পারিশ্রমিক বা পুরস্কার গ্রহণ কর।

আরও বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হবে; যারা মানুষের ইবাদত করতো তারা আজ কোথায়, দাঁড়ানো এবং যাদের জন্য আমল করতো তাদের কাছ থেকে সওয়াব গ্রহণ করো। আল্লাহ তো সমান্যতম ভেজাল আমলও গ্রহণ করেন না।

আরও একটি বিপদ হলো, রিয়া করার ফলে জান্নতের আশা ভন্ডুল হয়ে যায়। নাবী (সাঃ) বলেছেন; সেদিন বেহেশত বলে উঠবে এবং ঘোষণা করবে যে, কৃপণ ও রিয়াকারীর জন্য আমার (জান্নএত) মধ্যে প্রবেশ হারাম (নিষিদ্ধ)।

এ হাদীসের দুই ধরনের অর্থ হতে পারে। প্রথমত, কৃপণের অর্থ যে নেক কাজে কৃপণতা করে এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মদুর রাসুলুল্হা-এর ব্যাপারে কৃপনতা প্রদর্শন করে। আর রিয়া অর্থ হলো খুব মাত্মক। মূলত এ রিয়াকে মুনাফিকী বলা যায়-যারা নিজের ঈমান তাওহীদ বিশ্বাসকে প্রদর্শনীমূলক করে তোলে।

আর একটি অর্থ এই হতে পারে যে, কৃপণতা ও রিয়া থেকে যে বিরত না থাকে এবং নফসকে তা থেকে ছিুতেই রক্ষা করে না। শেষোক্ত অর্থে দুটি ভয়বহ বিপদ রয়েছে। কারণ এ জিনিসটি মানুষকে কুফরীর পর্যায়ে নিক্ষেপ করে।ফলে জান্নাতের আশা ভন্ডুল হয়ে যায়।অপরদিকে ঈমান কেড়ে নয়। মানুষ জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিপদ হচ্ছে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া কারণ আবু হুরায়রা (রাঃ) নাবী (সাঃ) এর উদ্বৃতি দিয়ে বলেছেন, কিয়অমতের দিন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে ডাকা হবে-কুরআনের কারী, আল্লাহর রাস্তায় জেহদকারী মুজাহিদ এবং মালার। কারীকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলবেন; আমি কি তোমাকে সেই কালাম শিখাইন, যে কালম আমি আমার রাসুলের ওপর নাযিল করেছিলাম? সে জবাব দেবে: হে আমার প্রতিপালক, অবশ্যই তা করছিলেন। আল্লাহ বললেন: আচ্ছ তুমি যা জানতে তা তুমি কিভাবে কাজে লগিয়েছ? কারী জবাব দেবেন: আমি দিন রাত কুরাআন পাঠ করতাম। কিন্তু আল্লাহ এমনকি ফেরেশতাগণও বললেন: তুমি মিথ্য বলছে। এর পর আল্লাহ বলবেন, তোমার তো আকাঙ্খা ছিল যে, লোকে তোমাকে কারি বলুক-তা তুমি যা আকাঙ্খা করতে তা তো পেয়েছোই অর্থাৎ দুনিয়ায় তোমাকে বলে অভিহিত করা হয়েছে।

এরপর মালদারকে ডাকা হবে। তাকে বলা হবে: আমি কি তোমাকে ধন-সম্পদের অধিকারী করিনি? সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক? নিশ্চয়ই তুমি তা করেছিলে। তখন ইরশাদ হবে: আচ্ছা যে মাল তোমাকে দিয়েছিলাম, তা কি তুমি কাজে লাগিয়েছে? সে জবাব দেবে, আমি তা দিয়ে আতীয়-স্বজন, পরিবার পরিজনের প্রতি হক আদায় ও সদকা-খয়রাত করেছি। কিন্তু আল্লহ এবং ফেরেশতারা তার এ কথা অস্বীকার করবেন। আল্লাহ বলবেন: তোমার তো উদ্দেশ্য ছিল লোকে তোমাকে দানশীল বলুক। দুনিয়ায় তোমাকে তা বলা হয়েছে।

এরপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীকে ডাকা হবে। অ্লাহ তাকে বলবেন দুনিয়ায় গিয়ে তুমি কি কাজ করেছ? সে জবাব বে: হে অাল্লাহ! তুমি তোমার রাস্তায় জিহাদের নির্দেশ দিয়েছিলে। সে জন্য আমি তোমার রাস্তায় জিহাদ করেছি-এমকি শেষ পর্যন্ত নিজে শহীদ হয়ে গেছি। তার এই কথাও অাল্লাহ এবং ফেরেশতারা অস্বীকার করবেন। আল্লহ্ বলবেন: তোমার উদ্দেশ্য তো ছিল দুনিয়াবাসী তোমাকে সাহসী এবং বীর বলুক-তোমার সে উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে।

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, হে আবু হুরায়রা! এদের দ্বারাই প্রথম জাহান্নামের অগুন জ্বালানো হবে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নাবী (সাঃ) বলেছেন, জাহান্নম এবং জাহান্নমের অধিবাসীগণ রিয়াকারিদের দেখে ভয় পেয়ে যাবে। জিজ্ঞাসা করা হলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! জাহান্নম কিভাবে ভয় পাবে? তিনি বললেন, তাদের (রিয়াকারীদের) যে আগুনের ভয়ে আযাব হবে, সেই আগুনের তেজ দেখে।

(ইমাম গাযযালী (র.) এর মিহাজুল আবেদীন অবলম্বনে)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*