যৌনদাসী থেকে নোবেল জয়ী | sampadona bangla news
বুধবার , ১৭ অক্টোবর ২০১৮

যৌনদাসী থেকে নোবেল জয়ী

সম্পাদনা অনলাইন : নাদিয়া মুরাদ তখন ২১ বছরের তরুণী। সালটা ২০১৪। ইরাকের পাহাড়ি অঞ্চল সিনজারে নাদিয়াদের ইয়াজিদি গ্রামে আকস্মিক হামলা চালায় আইএস জঙ্গিরা। চলে নির্বিচার গণহত্যা। গ্রামের প্রায় সব পুরুষ ও বয়স্ক নারীদের হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে নাদিয়ার ছয় ভাই এবং তার মাও ছিলেন।
জঙ্গিরা গ্রামের অন্য ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে নাদিয়াকেও ধরে নিয়ে যায় এবং যৌনদাসী হিসেবে বন্টন করে দেয়।নানা হাত ঘুরে একসময় মসুল পৌঁছে যান নাদিয়া। এই সময়ে তাকে আইএস জঙ্গিরা অসংখ্যবার ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করে।
এক পর্যায়ে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন নাদিয়া, ফল ধরা পড়া। বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা। কিছুদিন পর তাকে তাকে আবারও বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল। একদিন সুযোগ বুঝে আইএস বন্দিদশা থেকে পালিয়ে এক সুন্নি মুসলিম পরিবারে আশ্রয় নেন নাদিয়া। ওই পরিবার তাকে মসুল থেকে পালিয়ে আসতে সব রকম সহায়তা করে।নাসির নামে এক সুন্নি মুসলমান নাদিয়াকে স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে আইএসের কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা মসুল সীমান্ত পার করে দেন।
জীবনের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীকে জানাতে ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে একটি বই লেখেন নাদিয়া, যা ২০১৭ সালে প্রকাশ পায়।
ওই বইতে তিনি লেখেন, “কখনও কখনও ধর্ষিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই সেখানে ঘটত না। একসময় এটা প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।”
২০১৫ সালে শরণার্থী প্রকল্পের আওতায় জার্মানি পাড়ি জমান নাদিয়া। বর্তমানে সেখানেই তিনি বসবাস করছেন তিনি।একই বছর ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আইএসের হাতে নিপীড়নের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন নাদিয়া।
সেখান থেকে শুরু হয় নতুন জীবন। ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ শুরু করেন নাদিয়া। তিনি মানবাধিকার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহারের বিরুদ্ধেও কাজ শুরু করেন। এ লক্ষ্যে তিনি ‘নাদিয়াস ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।
কথিত ‘আইএস খেলাফত’ সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ইয়াজিদিকে হত্যা করে। ধরে নিয়ে যায় আরও অন্তত তিন হাজার ইয়াজিদি নারীকে, যাদের মধ্যে আট বছরের শিশুও ছিল।
সেপ্টেম্বর ২০১৬-এর হিসাবে, অ্যাটর্নি আমাল ক্লুনি জাতিসংঘের অফিস ও ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (ইউএনওডিসি) এর আগে বক্তব্য রাখেন যে তিনি জুন ২০১৬ সালে আইএসআইএল কমান্ডারদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপে ক্লায়েন্ট হিসাবে মুরাদকে প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করেন।[২০][১৮][১৯][২১] ক্লোনি আইএসআইএল কর্তৃক গণহত্যা, ধর্ষণ এবং পাচারকে চিহ্নিত করে একে “শিল্পের দাঁড়িপাল্লায় শয়তানের আমলাতন্ত্র” হিসেবে বর্ণনা করেন, এটিকে একটি দাসীর বাজার হিসাবে বর্ণনা করেন যা উভয়ই অনলাইনে, ফেসবুকে এবং মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে যা আজও সক্রিয়।[১২] মুরাদ তার কাজের ফলে তার নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি পেয়েছেন।[১১]
সেপ্টেম্বর ২০১৬-এ, টিনা ব্রাউন এর উপস্থাপনায় নিউইর্য়ক সিটিতে মুরাদ নাদিয়া’স ইনিশিয়েটিভ এর ঘোষনা দেন। উদ্যোগটি গণহত্যার শিকারদের পক্ষে সমর্থন ও সহায়তা প্রদান করবে।[২২] মানব পাচারের অবশিষ্টাংশের মর্যাদায় তিনি জাতিসংঘের প্রথম গুডউইল রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন।[২৩]

মে ৩, ২০১৭-এ মুরাদ ভ্যাটিকান সিটির পোপ ফ্রান্সিস এবং আর্চবিশপ গালাঘেরের সাথে সাক্ষাত করেন। বৈঠককালে তিনি “ইয়াজিদীদের সাহায্যের জন্য আবেদন করেন যারা এখনও আইএসআইএস বন্দীত্বের মধ্যে রয়েছেন, সংখ্যালঘুদের জন্য ভ্যাটিকানের সমর্থন স্বীকার করেছেন, ইরাকে সংখ্যালঘুদের জন্য স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটির সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন, ইরাক এবং সিরিয়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মুখোমুখি হওয়া বর্তমান পরিস্থিতি এবং চ্যালেঞ্জগুলি তুলে ধরেছেন, বিশেষকরে ঘটনার শিকার এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিচ্ছিন্ন অভিবাসী মানুষদের।”[২৪]

মুরাদের স্মৃতিকথা, দ্য লাস্ট গার্ল: মাই স্টোরি অব ক্যাপটিভিটি, এন্ড মাই ফাইট এগেইন্সট দ্য ইসলামিক স্টেট, ক্রাউন পাবলিশিং গ্রুপ কর্তৃক ৭ নভেম্বর, ২০১৭-এ প্রকাশিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*