মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী | sampadona bangla news
মঙ্গলবার , ২১ নভেম্বর ২০১৭

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%8f%e0%a6%a1%e0%a6%bf%e0%a6%9fসম্পাদনা অনলাইন : বৃটিশ-ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বৃহস্পতিবার। ‘মজলুম জননেতা’ খ্যাত বরেণ্য এই রাজনীতিক ১৯৭৮ সালের ১৭ নবেম্বর ছিয়ানব্বই বছর বয়সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। তিনি একাধারে ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থপতি। এই অবিসংবাদিত নেতার মৃত্যুদিনে তার স্মরণে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে। এদিকে, এ উপলক্ষ্যে আমৃত্যু গণতন্ত্রের লড়াকু ও গণমানুষের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনীতিবিদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশেষ বাণী দিয়েছেন।

ঐতিহাসিকদের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ বলছে, মওলানা ভাসানী ছিলেন দেশের সংগ্রাম ও সংকটে বিশাল সহায়। কখনোই কোনো পদমর্যাদা, লোভ-লালসা এবং মোহ তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। সরল-সহজ জীবনযাপন করেছেন তিনি, একই সঙ্গে সরল প্রাণের কৃষক-মজুর তার প্রিয় ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও যখন গণতন্ত্রের নামে এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছিল একের পর এক, যখন কেড়ে নেয়া হচ্ছিল বাক-ব্যক্তিস্বাধীনতা, তখনও সিংহের মতো গর্জে উঠেছেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। আদর্শ থেকে কখনও তিনি বিচ্যুত হননি। তিনি লড়াই করেছেন সব কালাকানুনেরও বিরুদ্ধে।

তার ওপর বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থ ও ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ অনুযায়ী, মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন হাজী শরাফত আলী খান। স্থানীয় স্কুল ও মাদরাসায় কয়েক বছর অধ্যয়ন ছাড়া তার বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তার জীবন ছিল গ্রামভিত্তিক, মতবাদ উগ্র এবং ঔপনিবেশিক রীতিনীতির প্রতি আস্থাহীন। সারা রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রচুর প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন এবং বেশ কিছু সাধারণ ও স্থানীয় নির্বাচনে জয়ীও হয়েছিলেন; তবে কখনও ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তার নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল কৃষক শ্রমিক জনসাধারণ, যাদের অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করে গেছেন।

মুসলিম লীগের ক্ষুব্ধ সদস্যরা ঢাকায় ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন এক কর্মী সম্মেলন আহবান করে। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় স্বামীবাগের রোজ গার্ডেনে। এতে প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি যোগদান করেন। ২৪ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে এটিই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করে) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল জন্মলাভ করে। এর সভাপতি হন মওলানা ভাসানী এবং টাঙ্গাইলের শামসুল হক হন সাধারণ সম্পাদক। পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে ভাসানী সবচেয়ে প্রতিবাদী এবং শ্রদ্ধেয় রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে ভাসানী তখনকার পাঁচটি বিরোধী দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি মোর্চা গঠন করেন। এ মোর্চার অপরাপর নেতা ছিলেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন লাভ করে এবং মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৭টি আসন।

এদিকে ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন এবং আতাউর রহমান খানকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী করা হয়। পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের ব্যাপারেও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মওলানা ভাসানীর মতবিরোধ দেখা দেয়। প্রস্তাবিত পাকিস্তান সংবিধানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভাসানী তীব্র প্রতিবাদ করেন। সোহরাওয়ার্দী পৃথক নির্বাচনের পক্ষপাতি ছিলেন। মওলানা ভাসানী তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘেষা বৈদেশিক নীতিরও বিরোধিতা করেন। তিনি চেয়েছিলেন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালে কাগমারিতে আওয়ামী লীগের এক সম্মেলন আহবান করেন। ঐ সম্মেলনে তিনি সোহরাওয়ার্দীর বৈদেশিক নীতির তীব্র বিরোধিতা করেন। এ মতবিরোধের কারণে দলে ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঐ বছর মওলানা ভাসানী ঢাকায় পাকিস্তানের সকল বামপন্থি দলের একটি সম্মেলন আহবান করেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। তিনি এ দলের সভাপতি হন এবং এর সেক্রেটারি জেনারেল হন পশ্চিম পাকিস্তানের মাহমুদুল হক ওসমানী। এ সময় থেকে মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থি রাজনীতি অনুসরণ করতে থাকেন।

ভাসানী আইয়ূব সরকারকে সা¤্রাজ্যবাদের লেজুড় হিসেবে গণ্য করেন এবং আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং তাকে মুক্তি দানের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। বিরোধীদলের কঠোর আন্দোলনের মুখে আইয়ূব খান পদত্যাগ করেন এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসীন হন। রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। মওলানা ভাসানী নির্বাচন বয়কট করে নবেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার কারণে প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেন। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের ‘ওয়ালাকুমুসসালাম’ বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। এ ছাড়াও কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান।

বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-র ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বার লাইব্রেরি হলে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সহযোগিতার কারণে গ্রেফতার হয়ে ১৬ মাস কারানির্যাতনের শিকার হন। পূর্ব বাংলায় খাদ্যজনিত দুর্ভিক্ষ রোধের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের দাবিতে ১৯৫৬-র ৭ মে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সরকার দাবি মেনে নিলে ২৪ মে অনশন ভঙ্গ করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে মওলানা ভাসানী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা মামলার আসামীদের মুক্তি দাবি করেন। ১৯৭০ সালের ৬-৮ আগস্ট বন্যা সমস্যা সমাধানের দাবিতে অনশন পালন করেন।

ভাসানী ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রদান করেন। এর আগে ১৮ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের জন্য তার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে মওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা ভারতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া মওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যে পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন এবং নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই। ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।

এদিকে ভারত সরকার গৃহবন্দী দশা থেকে মুক্তি প্রদানের পর মওলানা ভাসানী ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হন। সেদিন লক্ষাধিক নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ী লাল টুপি পরে মহান নেতাকে অভ্যর্থনা জানান। ১৯৭২-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তির বিরোধিতা করলেও মুজিব সরকারের জাতীয়করণ নীতি এবং ১৯৭২-এর সংবিধানের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। ১৯৭৩ সালে খাদ্যের দাবিতে ঢাকায় ১৫-২২ মে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। ১৯৭৪-এর ৮ এপ্রিল হুকুমতে রাব্বানিয়া সমিতি গঠন করেন। একই বছর জুন মাসে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলে টাঙ্গাইলের সন্তোষে গৃহবন্দী হন। ১৯৭৬-এর ১৬ মে বাংলাদেশ বিনাশী ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লংমার্চে নেতৃত্ব দেন।

কর্মসূচি : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গৃহিত দুদিনের কর্মসূচির শেষ দিন আজ সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকা থেকে দলটির একটি প্রতিনিধি দল টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজারের উদ্দেশে রওয়ানা হবে। এতে নেতৃত্ব দেবেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। প্রতিনিধি দল সকাল সাড়ে ৯টায় চেয়ারপারসন ও দলের পক্ষ থেকে মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবে। মাজার প্রাঙ্গণে সকাল ১০টায় আলোচনা সভা, দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে এবং তবারক বিতরণ করা হবে।

এ ছাড়া ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বাংলাদেশ (ন্যাপ বাংলাদেশ) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান ও বিশেষ অতিথি থাকবেন যথাক্রমে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএজডি) এর সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী আ স ম আব্দুর রব এবং বিশিষ্ট কবি ও গবেষক ফরহাদ মজহার। এ ছাড়া ন্যাপ বাংলাদেশ মওলানা ভাসানীর ওপর প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে স্মৃতিচারণমূলক লেখা/প্রবন্ধ আহ্বান করেছে- যা সংকলন আকারে প্রকাশ করা হবে।

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someone

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*