বিশ শতকের মুজাদ্দিদ মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ | sampadona bangla news
রবিবার , ২২ অক্টোবর ২০১৭

বিশ শতকের মুজাদ্দিদ মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ

সম্পাদনা অনলাইন : মোহাম্মদ আকরম খাঁর আবির্ভাব উনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তি পর্বে। তখন বিদেশি শাসন শোষণে বন্দি স্বদেশ। ১৮৫৭ সালের প্রথম আযাদি সংগ্রামে ব্যর্থ হবার পর দেশবাসী হতাশায় আচ্ছন্ন। মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর। এই দুঃসহ দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ বলেন, ‘যে যুগে মাওলানা সাহেবের কর্মজীবন শুরু সেছিল মুসলিম বাংলার পক্ষে অবিশ্রান্ত দুর্যোগের অমানিশা। বহুদিন আগে নিভে যাওয়া জ্ঞানের প্রদীপ তখনো সমাজের বুকে আবার জ্বলে উঠে নাই। প্রতিবেশী সমাজের জমিদারদের জুলুম ও মহাজনের শোষণ-উভয় প্রকারে অতিষ্ঠ মুসলিম কৃষকদের কতক আত্মরক্ষার জন্য সাপ ও বাঘ ভরা আসামের জঙ্গলে চলে গেছে; বাকিরাও ঐ উদ্দেশ্যে তল্পীতল্পা বাঁধতে উদ্যত। ঘুঘু চরানো ভিটার নিঃস্ব চাষি পরিবার ভাঙা কুলা, ছেঁড়া কাঁথার পুঁটলি কাঁধে যে অতি হাহাকারে আকাশ বাতাস কাঁদিয়ে আসামের পথে চলেছে, সে দৃশ্য যারা নিজ চোখে না দেখেছে তারা তার নির্মমতা হাজার ভাগের একভাগও আজ উপলব্ধি করতে পারবে না। সেই নৃশংস অভিযানের বিরুদ্ধে যারা বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মওলানা সাহেব তাঁদের কতিপয়ের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। আমরাও তাঁদের চেলাদের মধ্যে গণ্য ছিলেন।’ (আবু জাফর সংকলিত ও সম্পাদিত মওলানা আকরম খাঁ, পৃ: ১২৪-১২৫)

ব্রিটিশরা বাংলা দখল করেই মুসলমানদের কৃষ্টি কালচার, রাজনীতি, অর্থনীতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। সেই আক্রমণের ঘূর্ণিবাতাসে খড়কুটোর মতো উড়তে থাকে মুসলমানরা। এই ট্র্যাজেডি সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টার ১৮৭০ সালে বলেন, ‘উচ্চস্তরের বা নিম্নস্তরের সমস্ত চাকরি ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ করে হিন্দুদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সরকার সকল শ্রেণির প্রজাকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য, তথাপি এমন সময় এসেছে যখন মুসলমানদের নাম আর সরকারি চাকুরেদের তালিকায় প্রকাশিত হচ্ছে না, কেবল তারাই চাকরির জায়গায় অপাঙ্ক্তেয় সাব্যস্ত হয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবন কমিশনারের অফিসে চাকরিতে কতিপয় লোক নিয়োগের দরকারিতা দেখা দেয়, কিন্তু অফিসারটি সরকারি গেজেটে কর্মখালীর যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন তাতে বলা হয় যে, এই শূন্য পদগুলোতে কেবল হিন্দুদের নিয়োগ করা হবে। মোটকথা হলো, মুসলমানদের এতটা নিচে ঠেলা দেয়া হয়েছে যে, সরকারি চাকরির জন্য দরকারি যোগ্যতা অর্জন করা সত্ত্বেও সরকারি বিজ্ঞপ্তি মারফত জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তাদের জন্য কোনো চাকরি খালি নেই। তাদের অসহায় অবস্থার প্রতি কারও দৃষ্টি নেই এবং এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করতেও রাজি নয়।’ (দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, পৃ ১৫৩-১৫৪) বর্তমান প্রজন্ম হান্টারের মূল্যায়নকে বাড়াবাড়ি বলতে পারেন। কিন্তু ইহাই নির্মম বাস্তবতা। এ বয়ানে কোনো কল্পনার মিশেল নাই।

বিলাতি শাসনে বাংলার মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলধারার ভূমিজপুত্র তথা মুসলমানদের ওপর নেমে অন্ধকারের ঘোর অমানিশা। মুসলমানরা মুসলিম আমলে শেকড় থেকে শিখরে চড়েছিলেন। সেখান থেকে ছিটকে পড়ে ব্রিটিশ আমলে। মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে সরকার। প্রতিবেশী সম্প্রদায় ও ইংরেজরা অফিস আদালত, ব্যবসা বাণিজ্য, জমিদারী থেকে ইমানদারদের উচ্ছেদ করে তাদের অধিকারে নেয়। উচ্চবিত্ত মুসলিমরাও রাতারাতি কৃষক-মজুরে পরিণত হয়। সৃষ্টি হয় হিন্দুজমিদারদের দোর্দ- প্রতাপ।

আযাদ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহরু হিন্দু জমিদারদের বিষয়ে কিঞ্চিত আলোকপাত করেছেন। ১৯৩২ সালের ৭ই ডিসেম্বর তিনি লিখেন,‘ভারতের অন্যান্য সমস্ত প্রদেশের চেয়ে বাঙলাদেশেই মুসলমানদের সংখ্যা বেশি। এরা ছিল গরিব প্রজা বা অতি ক্ষুদ্র ভূস্বামী। জমিদার সাধারণত হত হিন্দু; গ্রামের বানিয়াও তাই। এই বানিয়াই হচ্ছে টাকা ধার দেবার মহাজন আর গ্রামের মুদি। কাজেই এই জমিদার এবং বানিয়া প্রজার ঘাড়ে চেপে বসে তার রক্ত শুষে নেবার সুযোগ পেত। সুযোগের যথাসাধ্য সদ্ব্যবহারও করে নিতে ছাড়ত না। এই কথাটা মনে রাখা দরকার। কেননা হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে যে বিবাদ তার মূল রয়েছে এখানে।’ (জওহরলাল নেহরু: বিশ^-ইতিহাস প্রসঙ্গ, পৃ ৪০৭) জমিদার ও মহাজনরা ছিলো রক্তচোষা। তারা মুসলমানদের শেষ সম্বল ভিটেমাটিও কেড়ে নিত। এইসব জমিদার ও মহাজনদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী লৌহমানব ছিলো কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জমিদার কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুররা মুসলমানদের মনে করতেন জন্তু জানোয়ার তুল্য। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুমিত সরকার ‘দি স্বদেশি মুভমেন্ট’ কিতাবে লিখেছেন, ‘নীরদ চন্দ্র চৌধুরী কিশোরগঞ্জে কৈশোরের দিনগুলির কথা স্মরণ করে প্রাক ১৯০৫ হিন্দু ভদ্রলোকদের মুসলমানদের প্রতি তাদের আচরণের কথা প্রসঙ্গে ‘চার পর্র্যায়ের’ কথা বলেছেন। ….‘আমাদের চতুর্থ অনুভূতি ছিল মুসলমান কৃষকদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ মিশ্রিত। আমরা তাদেরকে আমাদের ‘লাইভস্টক বা গৃহপালিত পশু মনে করতাম’। কথাগুলো খুব কড়া, তবে মূলতঃ মিথ্যা নয়। কেউ কেউ এ লেখায় সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ শুকতে পারেন। কিন্তু এটিই ছিলো তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও নির্মম বাস্তবতা।

জীবনযুদ্ধের সর্বক্ষেত্রে মুসলমানদের হেনস্থা করতে থাকে নেটিভরা। সাম্প্রদায়িক মুশরিক ও বিলাতিরা এদেশের আদিবাসী মুসলিমদের বিদেশি, আগ্রাসি ও নরখাদক হিসেবে প্রমাণের নানাবিধ প্রয়াস চালায়। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মুসলমানদের আখ্যায়িত করেছেন, ‘পাপীষ্ঠ যবন’। ঈশ^রচন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, ‘যবনের যত বংশ একেবারে হবে ধ্বংস।’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, নেশাখোর মুসলমানদের না তাড়াইলে আর হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে না।’ কংগ্রেস ও মহাসভা নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘মুসলমান ইনসান হৌ তো জানোয়ার কৌন হো’। নাট্যকার মনোমোহান গোস্বামী ‘পৃথ্বিরাজ’ নাটকে লেখেন: ‘হিন্দুর প্রধান কার্য যবন (মুসলমান) নিধন।’ কবি হেমচন্দ্র লিখেছেন, ‘পাষ-, বর্বর, নিষ্ঠুর মুসলমান।’ কবি দীনবন্দু মিত্র বলেছেন, দুরাচার আওরঙজীব।’ কবি নবীনচন্দ্র সেন বয়ান করেছেন, ‘যবনের পাপ অগণিত।’ কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, মুসলমান লুণ্ঠক, ধ্বংসক, ধর্ষক।’ বাঙালি মুসলিমরা প্রতিবেশী পৌত্তলিক ধর্মশ্রেণি কর্তৃক যখন এই কঠিন দুর্বিষহ পরিবেশের মুখোমুখি তখন মাওলানা আকরম খাঁ নক্ষত্ররাজ হয়ে পদার্পণ করেন বাংলার মাটিতে।

আহলে হাদিস পত্রিকা ও আখবারে মোহাম্মদী কাগজের মাধ্যমে আকরম খাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। ১৯০৩ সালে মাসিক মোহম্মদী, ১৯১০ সালে সাপ্তাহিক মোহাম্মদী ও দৈনিক খাদেম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৫ সালে আল ইসলাম, সাপ্তাহিক সেবক, তারপর ১৯২০ সালে উর্দু দৈনিক জামানা, ১৯২১ সালে বাংলা দৈনিক সেবক, ১৯২২ সালে দৈনিক মোহাম্মদী, ১৯৪৬ ইংরেজি সাপ্তাহিক কমরেড তার সাংবাদিকতার কীর্তি। বাংলার মানুষকে জাগাবার জন্য ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশ করেন দৈনিক আজাদ।

মওলানা আকরম খাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে, কোরআন শরীফ(১৯০৫), যীশু কি নিষ্পাপ (১৯১৫), এসলাম মিশন(১৯১৭), আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালার রিপোর্ট(১৯১৮) মোস্তফা-চরিত (১৯২৫), উম্মুল কেতাব (১৯২৯), সমস্যা ও সমাধান (১৯৩১), বারোয়ারী (উপন্যাস, যৌথ, ১৯৩১), পাকিস্তান নামা বা নয়া রাহে নাজাৎ (কবিতা, ১৯৪৩), তাফসীরুল কুরআন (১৯৫৯-৬০), বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রীষ্টান ধর্ম (১৯৬২), মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস (১৯৬৫)। এছাড়া রয়েছে ফার্সি গুলিস্তার বঙ্গানুবাদ, মুক্তি ও ইসলাম, কারাগারের সওগাত, মিশ্র ও স্বতন্ত্র নির্বাচন, ব্যাক টু দ্যা কুরআন, ইসলামী শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য, ইসলাম এর আদর্শ, রমজানের সাধনা প্রভৃতি। মানবদরদি এ আলেমের প্রতিটি রচনা পা-িত্য, গবেষণা ও তথ্যপূর্ণ। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আবুল ফজল বলেছেন, ‘—-আকরম খাঁর উচ্চসাহিত্যিক মান ও সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, জীবনের প্রতি স্তরে ঘটেছে বিবর্তন। দেশ ও দশের পরিবেশ ওলট-পালট হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বা মওলানা আকরম খাঁর সাহিত্যিক মানের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি, হয়নি বিন্দুমাত্র অবনমিত। রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ধ্যান-ধারণায় আমি বিপক্ষ শিবিরের লোক। তবুও আকরম খাঁর বিশুদ্ধ ও নির্বাচিত শব্দ সমন্বয়ে গঠিত সুসংঘবদ্ধ ভাষা ও তার সুগভীর ভাব পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাই আমি তাঁর রচনার একজন পরম ভক্ত। ক্লাসিক রচনার স্পর্শে আকরম খাঁর ভাষা সুসমৃদ্ধ।’ ক্লাসিক বা ধ্রুপদী সাহিত্যের সংজ্ঞা নিয়ে নানাজনের নানাবিধ মত। আমরা সাধারণত উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্যকেই ধ্রুপদী সাহিত্য বুঝি। সে হিসেবে আকরম খাঁর লেখনী শুধু উৎকৃষ্টই নয় অত্যেৎকৃষ্ট মানে উত্তীর্ণ। ভাব, ভাষা, যুক্তিতর্ক ও স্বাধীন আলোচনায় অনন্যকিতাব আল কুরআনের তাফসির ও নবীর জীবনগ্রন্থ। শতবর্ষ পরেও এই মানের গ্রন্থ অনুপস্থিত।

প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘এ জাতির জন্য যারা পাহাড় কেটে কেটে প্রশস্ত পথ তৈরি করেছেন, মওলানা আকরম খাঁ তাদের একজন পুরোধা পুরুষ। বিশেষত ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন এবং একটি স্বাধীন জাতি গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। সেকালে এ অঞ্চলের অনগ্রসর মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মুক্তির জন্য তার শতবর্ষব্যাপী সংগ্রাম ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সময়ের সাক্ষী ‘কাল পুরুষগণ’ তাঁর অবদানকে নানা অভিধায় অভিহিত করেছেন।— তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জনক, বিশুদ্ধচারী রাজনীতিবিদ, ধ্রুপদ সাহিত্যিক, অগ্রসর চিন্তানায়ক, যুক্তিবাদী ইসলামী চিন্তাবিদ এবং সফল সমাজ সংস্কারক।’ (দৈনিক বণিক বার্তা, আগস্ট ২৪, ২০১৬) আবদুল হামিদ খান ভাসানী তাঁকে বলছেন: ‘আদর্শবান নির্ভীক সেনানী’, আবুল মুনসুর আহমেদ বলেছেন: ‘সকল অমৃত ফলের কল্পতরু’, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আমরা তাঁকে সকলেই শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম। তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের কিছুই বলার ছিলানা’, কবি জসিম উদদীন ‘জাতির মহান পিতা’, আবুল হাশিম ‘মহান নেতা’, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ‘তাঁর জীবন সবার অনুপ্রেরণার স্থল’, মওলা বখশ নদভী ‘জাতি তাঁর দান চিরকাল স্মরণ রাখতে বাধ্য’, ড. এনামুল হক ‘এক শতাব্দির জীবন্ত প্রতীক’, মুফতি দীন মোহাম্মদ খান ‘বাবায়ে ওলামা’, কে.জি. মোস্তফা ‘মুসলিম সাংবাদিকতার তিনি জনক’, ড. আলিম আল-রাজী ‘অবিভক্ত বাংলার মুসলিম জাগরণের কর্ণধার’, আবুল কালাম শামসুদদীন ‘অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ প্রতিভা’, ড মুহম্মদ আবদুল্লাহ ‘আযাদি আন্দোলনের নকিব’, আবদুস সালাম ‘সকল সাংবাদিকতার তিনি গুরু’, মুজিবুর রহমান খাঁ ‘সংবাদজগতের গুরু’, মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী ‘সীমান্ত মোজাহেদিনের যোগ্য বংশধর’, জহুর হোসেন চৌধুরী ‘শক্তিধর পুরুষ’, কবি শাহাদাৎ হোসেন ‘হে যুগ-পুরুষ! তোমার সাধনে জাতির জীবন জাগে!’ মোহাম্মদ মোদাব্বের ‘আপোষহীন মুক্তির সাধক’, মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ ‘দেশবরেণ্য জননায়ক’, আতাউর রহমান খান ‘বাঙালি মুসলমানদের মুক্তিসংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রসেনা’, আবদুল মালেক উকিল ‘অবিভক্ত বাংলার জনপ্রিয় ব্যক্তি’, জহিরুদ্দিন ‘শতাব্দির জীবন্ত ইতিহাস’, আসাদুজ্জামান খান ‘নিঃশ^ার্থ সংগ্রামী’, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ‘কালের পুরোধা’, মোহাম্মদ আবদুর রবের মতে, ‘আজ যে বাংলাদেশের মুসলমান বিশ^ মুসলিম সভায় আপন আসন লাভে সমর্থ হয়েছে- তার পিছনে অন্যতম প্রেরণা হয়ে যে নামটি উচ্চকিত- সে নাম মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ’, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এর ভাষায় ‘মননশীল লেখক’, আকবর উদ্দীনে কাছে বিরাট মহীরুহ, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের মতে, ‘বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক, সমাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের তিনি ¯্রষ্টা ও পথিকৃৎ-তিনি একাধারে জনক ও শিক্ষক’। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর ভাষায় ‘সুদীর্ঘ জীবন বিচিত্র কর্মসমাবেশে সমৃদ্ধ’। ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন এর কাছে ‘যুক্তিবাদী প-িত ও যুক্তিবাদী মনীষা’, আবুল ফজলের মতে ‘একটি নাম একটি ইতিহাস’। অধ্যাপক মুহম্মদ মুনসুরউদ্দীনের কাছে ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের সেবক’, খোন্দকার আবদুল হামিদের মতে ‘আকরম খাঁর ঋণ অপরিশোধ্য’। সানাউল্লাহ নূরীর মতে ‘ভলতেয়ারের তুল্য’। আখতার-উল-আলমের মন্তব্য ‘শতাব্দিকালের জীবন্ত ইতিহাস’। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ভাষ্যে ‘কিংবদন্তীর রাজা’। ড. আনিসুজ্জামানের বয়ান ‘কুসংস্কার ও ইংরেজ শাসনবিরোধী’। দেওয়ান আবদুল হামিদের ভাষ্যে ‘বক্তা, সমাজ সেবক ও খ্যাতনামা সাহিত্যিক’। মুহিউদ্দীন খানের মতে ‘বিস্ময়কর সংগ্রামী প্রতিভা’। সৈয়দ ওয়াহিদ কাইসর নাদভীর মতে ‘আলেম ফাজেল ও ধর্মভীরু তাপসী।

কবি সুফিয়া কামালের মতে, ‘জ্ঞানের সাধক’। শাহাবুদ্দিন আহমদ আখ্যা দিয়েছেন ‘রূপকথার নায়ক-কালজয়ী বীর’ অভিধায়। আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘হে অভিযাত্রিক’। নুরুল ইসলাম কাব্যবিনোদের মতে ‘চির ভাস্বর’। মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আখ্যা দিয়েছেন ‘মুয়াজ্জিন’ উপাধিতে। বৈচিত্র্যময় সংগ্রামী জীবন, মহান দার্শনিক, জাতীয় বুদ্ধিজীবী, জাতির মনোভাবের প্রতীক, দুর্গম পথের যাত্রী, আলোকরশ্মির ধারক, শতাব্দির মুজাদ্দিদ ইত্যাদি বিশেষণে। আমরা বলব ‘লাইভস্টক’দের মানুষ বানাবার প্রধান কারিগর ছিলেন মওলানা আকরম খাঁ।

মওলানা আকরম খাঁর বর্ণাঢ্য শতবর্ষব্যাপী জীবন ছিল বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্মজাগৃতির ইতিহাস। মননশীল সুলেখক, চিন্তাবিদ, বাগ্মী, উদার মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি আকরম খাঁ। আজকে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় নিযুক্ত সবাই-ই তাঁর উত্তরসূরী। দৈনিক ইত্তেফাকের উপদেষ্টা সম্পাদক মরহুম আখতার-উল-আলম লিখেছেন, ‘কবিগুরু গ্যাটে সম্পর্কে বলতে গিয়ে জনৈক সমালোচক বলেছিলেন, পাশ্চাত্যের কোনো লেখক বা সাহিত্যিক স্বীকার করুক বা না করুক, তারা প্রত্যেকেই গ্যাটের শিষ্য। এই কথার প্রতিধ্বনি করে আকরম খাঁ সম্পর্কে নির্দ্ধিধায় বলা চলে যে, আধুনিক বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে সকলেই বিশেষত: যারা সমাজ ও স্বজাতি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে থাকেন, তাদের মত ও পথ যা-ই থাক, কর্মক্ষেত্র যাই হোক না কেন, তাদের কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, তারা প্রত্যেকেই মাওলানার শিষ্য, প্রশিষ্য বা ভাবশিষ্য। মোহাম্মদ আকরম খাঁর জীবন ও সাধনার সাফল্য ও সার্থকতার এটাই প্রথম ও শ্রেষ্ঠ পরিচয়।’ (আবু জাফর সংকলিত ও সম্পাদিত মওলানা আকরম খাঁ, পৃ ১৫১)

যাঁরা স্বাধীনতার বন্ধুর পথের বাধা সরিয়ে দিতে নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন মওলানার মর্যাদা তাদের সবার ওপরে। ব্রিটিশদের দমন, শোষণ, নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত কৃষক মজুরদের আশ্রয়স্থল হয় মওলানার দরবার। প্রায় পৌনে এক শতাব্দি যাবত জাতীয় জীবনের সর্বত্র তাঁর পদচারণা দেখতে পাই। আযাদি সংগ্রাম, স্বরাজ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, বেঙ্গল প্যাক্ট, শিক্ষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইয়ে তাঁর সরব উপস্থিতি সামনের সারিতে। কোলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দুদের চোখরাঙানি, বিলাত সরকারের হুমকি ধামকি, খানকা-মাযার পূজারীদের ফতোয়া উপেক্ষা করে অকুতোভয়ে ময়দানে সক্রিয়ভাবে মানবতায়, পরের স্বার্থে জীবন কুরবানি করেছেন। বড়ই পরিতাপের বিষয়, হাল আমলের শিক্ষক বা ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। এজন্য দরকার স্কুল, কলেজে তাঁর জীবনী, প্রবন্ধ-নিবন্ধ সংযোজন। একই সাথে বিশ^বিদ্যালয়ে উচ্চ গবেষণার জন্য থিসিস চালু করা জরুরি।

এ মহানায়কের বইপুস্তক বর্তমানে দুর্লভ। তাঁর রচনাবলি সংগ্রহ ও প্রকাশ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। বাংলা একাডেমিকেই এ গুরুদায়িত্ব বহন করা উচিত। প্রাইভেট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, সুনীল, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের বই-কিতাবাদি প্রকাশ ও প্রচারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কিন্তু বিশ^ব্যক্তিত্ব মওলানা আকরম খাঁর রচনাসমগ্র প্রচারে তারা অনাগ্রহী। তাওহিদপন্থী তথা সেকুলার বিরোধী হবার কারণেই তিনি অবহেলার পাত্র। এই হীনমন্যতা ও অবিমৃশ্যকারিতা দূর করতে হবে। তাঁর সম্পাদকীয়, বক্তৃতাবলি, কলামসমগ্র, প্রবন্ধরাজি সংগ্রহ করে বই আকারে বের করা জাতীয় দায়িত্ব। এই গবেষণাকর্মে অগ্রসর হতে হবে গবেষকদের। ইসলামী ফাউন্ডেশনও এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

হদিস:

১। আবু জাফর সংকলিত ও সম্পাদিত মওলানা আকরম খাঁ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় সংস্করণ মে ২০০৭

২। উইকিপিডিয়া; ০৬ আগস্ট ২০১৭

৩। মাসিক অগ্রপথিক, আগস্ট ২০০৭ (নাসির হেলাল: মওলানা আকরম খাঁ জীবন ও কর্ম)

৪। শেখ মুজিবুর রহমান: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেড ক্রিসেন্ট হাউস, মতিঝিল ঢাকা ১০০০, প্রথম সুলভ সংস্করণ সেপ্টেম্বর ২০১৪

৫। দৈনিক বর্ণিক বার্তা, আগস্ট ২৪, ২০১৬ (ড. আবদুল লতিফ মাসুম, মওলানা আকরম খাঁ)

৬। দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১০ জানুয়ারি ২০১৭ (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম: অগ্রনায়ক মওলানা আকরম খাঁ)

৭। ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় সংস্করণ নভেম্বর ২০০২

৮। আব্বাস আলী খান: বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জুন ২০০২

৯। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮), বাংলা একাডেমি ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭

১০। মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক, ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন, বাংলা একাডেমি ঢাকা, তৃতীয় মুদ্রণ জুন ২০০৯।

১১। আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলি, তৃতীয় খ-, বাংলা একাডেমী ঢাকা ১০০০, প্রথম প্রকাশ জুন ২০০১।

১২। জওহলাল নেহরু: বিশ^-ইতিহাস প্রসঙ্গ (গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্টরি এর তরযমা), আনন্দ পাবলিশার্স, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ০০৯, নবম মুদ্রণ, জুন ২০১৬

১৩। ওবায়দুল হক সরকার: বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে ইতিহাস, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি. জুলাই ২০০৭, পৃষ্ঠা ৪৬।

১৪। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার: দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, (তরযমা- এম আনিসুজ্জামান, খোশরোজ কিতাব মহল, ১৫ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০, পুনর্মুদ্রণ ২০০০

১৫। মোহাম্মদ আকরম খাঁ: মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, আজাদ এন্ড পাবলিকেশন্স লি: ঢাকেশ^রী রোড, ঢাকা-২, প্রথম সংস্করণ নবেম্বর ১৯৬৫

জন্ম: জুন ৭, ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দ

চব্বিশ পরগণা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত(বর্তমান ভারত)

মৃত্যু : আগস্ট ১৮,১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ

বংশাল, ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান(বর্তমান বাংলাদেশ)।

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someone

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*