প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কী রয়েছে? | sampadona bangla news
মঙ্গলবার , ১৭ জুলাই ২০১৮

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কী রয়েছে?

সম্পাদনা অনলাইন : প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের দুই মন্ত্রী আর এক প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে করে করে উদ্বেগ জানিয়েছেন সম্পাদক পরিষদের সদস্যরা। তাদের আপত্তিগুলো অনেকাংশে যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

গত ২৯শে জানুয়ারি ২০১৮ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামের একটি নতুন আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা। গত জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইনটির ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “আইসিটি অ্যাক্টের অপরিচ্ছন্ন যে ৫৭ ধারা ছিলো, সেটিকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ৫৭ ধারার যে অপরাধ, সেগুলো বিস্তারিতভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে”।

কিন্তু এর আগে থেকেই প্রস্তাবিত নতুন এই আইনটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, আইনটির অনেক ধারায় হয়রানি ও অপব্যবহার হতে পারে।

সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ : বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশের দুই মন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এই আইনের বিষয়ে বৈঠক করেছেন দেশের গণমাধ্যমের সম্পাদকদের একটি সংগঠন, সম্পাদক পরিষদ।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য যোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার এবং আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলকের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন সম্পাদক পরিষদের সদস্যর। সেখানে এই আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তারা তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেন।

তাদের মুখপাত্র ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বিবিসিকে বলেন, ”আমাদের উদ্বেগ বেশ কয়েকটি ধারাতে। আমরা মনে করি, স্বাধীন সাংবাদিকতা ব্যহত হবে, স্বাধীন মতপ্রকাশ ব্যাহত হবে, এরকম বেশ কয়েকটি ধারা উপধারা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সেগুলো আমরা তাদের বলেছি। আরেকটি ধারাতে পুলিশকে যে অধিকার দেয়া হয়েছে যে, সন্দেহ বশবর্তী হয়ে তারা একটি মিডিয়া হাউজে ঢুকতে পারবে বা প্রয়োজনে গ্রেপ্তারও করতে পারবে, এ ধরণের বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।”

”অনেক ব্যাপারেই ওনারা (মন্ত্রীরা) আমাদের উদ্বেগটা সিরিয়াসলি গ্রহণ করেছেন,” বলছেন মি.আনাম। বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ”সম্পাদক পরিষদ যে আপত্তিগুলো তুলেছে, সেগুলো অনেকাংশে যৌক্তিক। তবে আইনটি এখন সংসদীয় কমিটিতে আছে। সেখানে আমি প্রস্তাব করবো যেন সম্পাদক পরিষদকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।”

২২শে এপ্রিল সংসদীয় কমিটির একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে আইনমন্ত্রী বিষয়টি তুলবেন বলে জানিয়েছেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, ”সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, এটা ফ্রিডব অব প্রেস বা ফ্রিডম অব স্পিচ বন্ধ করার জন্য নয়। আইনে কোন ক্রুটি বা দুর্বলতা থাকলে সেগুলো সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করা হবে।”

সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে এই বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ একমত পোষণ করেছেন যে, সাইবার সিকিউরিটির জন্য একটি আইনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু স্বাধীন সাংবাদিকতা বা মতপ্রকাশের কোন বাধা দেশের জন্য, সাংবাদিকতার জন্য ভালো হবে না বলে তারা বৈঠকে জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কী রয়েছে? : গত জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইনটির ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “আইসিটি অ্যাক্টের অপরিচ্ছন্ন যে ৫৭ ধারা ছিলো, সেটিকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ৫৭ ধারার যে অপরাধ, সেগুলো বিস্তারিতভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে”।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছিলেন, যে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বাতিল করে তার পরিবর্তে এসব ধারার অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হবে।

তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকবার সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে বা আইসিটি বা অন্য আইনে যা নেই, সেটিই নতুন আইনে রাখা হয়েছে।

নতুন এই আইনের অধীনে মামলা হলে অভিযোগ গঠনের তারিখে হতে ৬ মাসের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে হ্যাকিং-এর শাস্তি ১৪ বছর কারাদণ্ড বা কমপক্ষে এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী-

• ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জন শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।

•কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত যদি কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে গণ্য হবে এবং এজন্য ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

•খসড়া আইনে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য জাতীয় কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে।

•আইনের ২১ ধারার প্রস্তাব অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

•আর ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার জন্য ওয়েবসাইট বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কিছু প্রচার বা প্রকাশ করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

•ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দ্বিতীয় খসড়ায় দেখা যাচ্ছে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় আলোচিত ‘মানহানি’, ‘মিথ্যা-অশ্লীল’, ‘আইন শৃঙ্খলার অবনতি’ ও ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ এই বিষয়গুলো আইনের ১৯ ও ২০ ধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

•৫৭ ধারায় সাজা ছিল ৭-১৪ বছর ১৯ ধারায় সেটি ২ মাস থেকে দুই বছর ও ২০ ধারায় ১ থেকে ৭ বছর। জরিমানার ক্ষেত্রেও ৫৭ ধারায় সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২ থেকে ৭ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। আর ৫৭ ধারায় মামলা জামিন অযোগ্য থাকলেও ১৯ ও ২০ ধারায় মামলা জামিনযোগ্য করা হচ্ছে।

•আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় যেখানে ‘নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ’ এবং ‘রাষ্ট্র ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ’ এই শব্দগুলি ছিল, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সেটি ‘মনকে বিকৃত ও দূষিত করা’ এবং ‘মর্যাদাহানি ও হেয় প্রতিপন্ন’- এভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

•কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের বিষয়েও বিধান রয়েছে এই আইনে। সেখানে ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম. কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ব্যাহত করে, এমন ডিজিটাল সন্ত্রাসী কাজের জন্য অপরাধী হবেন এবং এজন্য অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড অথবা এনধিক এক কোটি অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

•ছবি বিকৃতি বা অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে কারো ব্যক্তিগত ছবি তোলা, প্রকাশ করা বা বিকৃত করা বা ধারণ করার মতো অপরাধ করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ইন্টারনেটে পর্নগ্রাফি ও শিশু পর্নগ্রাফির অপরাধে সাত বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

•কোন ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোন ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া অনলাইন লেনদেন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

আগে ৫৭ ধারায় মামলা হলেই যে গ্রেফতার করার বিধান ছিল, সে বিষয়ে এখন অপরাধ বিবেচনা করে কোনটি জামিনযোগ্য আর কোনটি অজামিনযোগ্য, তা ভাগ করে দেয়া হয়েছে।

আইনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে? : গত ২৯শে জানুয়ারি বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায় আইনটির খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এখন সেটি আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে রয়েছে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে যাচাই বাছাই এবং আলোচনা হবে। ২২শে এপ্রিল কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

তাদের অনুমোদন পাওয়া গেলে খসড়াটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপিত হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন পেলে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে আইন পাশের জন্য। সেখানে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর শেষে এটি আইন হিসেবে কার্যকর হবে।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বেগ : তথ্য প্রযুক্তি আইনের বেশ কয়েকটি ধারার অপব্যবহার নিয়ে গণমাধ্যম কর্মী ও সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই আইনের সুযোগে অনেককে হয়রানিরও অভিযোগ উঠেছে। তবে আইনের নানা দিক নিয়ে অনেক সমালোচনাও তৈরি হয়েছে।

আশংকা করা হচ্ছে যে, প্রস্তাবিত আইনটিতে সেই ধারাগুলোই ভিন্ন আঙ্গিকে রয়েছে। অনেকে আশংকা করেন, এর অনেক ধারার হয়রানি আর অপপ্রয়োগের সুযোগ রয়ে গেছে।

তবে বাংলাদেশের সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে যে, বাক্ স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রোধ করা এই আইনের উদ্দেশ্য নয়। সাইবার অপরাধ দমনই আইনটির লক্ষ্য।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*