নফসে আম্মারার পরিচয় ও দমন | sampadona bangla news
বুধবার , ১৫ আগস্ট ২০১৮

নফসে আম্মারার পরিচয় ও দমন

মসজিদে নববীস’দী: নফসে আম্মারা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ইবাদতকামী ব্যক্তির জন্য একান্ত প্রয়োজন ও জরুরী। কেনন, এটা সবচাইতে ভয়াবহ, মারাত্মক ও ধ্বংসকারী দুশমন। এ দুশমন থেকে যে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়, তা খুবই মারাত্মক এবং তা প্রতিরোধ করা খুবই কঠিন। এ নফসে আম্মারার রোগেরও শেষ নাই আর রোগগুলোর চিকিৎসাও খুব কষ্টসাধ্য। দুটি কারণে নফসে আম্মারা এমন বিপজ্জনক হয়।

এক. এটা হলো অভ্যন্তরীণ শক্র। ডাকাত যখন ঘরে, তখন তার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ অনেক বেশী সে ক্ষতিও করতে পারে। এ জন্যই কোন এক ব্যক্তি বলেছেন: আমার আহবানকারী আমার যে ক্ষতি করেছে, আমার নফস তার প্রভাব কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না। কেননা, সে আমার রোগ ও বেদনা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি সে দুশমনীকে কিভাবে প্রতিরোধ করতে পারি, যে দুশমনের বাসা আমারই বুকের ভিতরে।

দুই. নফস হলো প্রিয় শত্রু। একথা সত্য যে, মানুষ তার বন্ধুর দুশমনী সম্পর্কে সবসময় বেখবর ও উদাসীন থাকে। মানুষের চোখে তার বন্ধুর কোন দোষই ধরা পরে না। কিন্তু অসন্তষ্টির দৃষ্টি সকল ত্রুটিকে প্রকাশ করে দেয়। কাজেই এমনি পরিস্থিতিতে মানুষ তার নফসের যাবতীয় বিষয়কেই উত্তম মনে করবে, এতে সন্দেহের কি অাছে? সে তো কিছুতেই নফসের দোষ বের করতে পারে না। ফলে নফস সব সময় মাসুষের ক্ষতি করার সুযোগ পায় বেশী। এমনকি এভাবে নফস যদি মানুষকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়েও উপনীত করে, তারপরও সে তা বুঝতে পারে না। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ যদি কাউকে নিজ করুণা দিয়ে রক্ষা করেন তবে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। এজন্যই একটি হাদিসে দেখা যায়: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, একদা কজন সাহাবী হুযুর (সাঃ)–এর নিকট আসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা আমাদের অন্তরে এমন সব কল্পনা পেয়ে থাকি যা বলা অতীব মারাত্মক। হুযুর (সাঃ) ফরমান, প্রকৃতই এরূপ কিছু তোমরা পেয়ে থাক? সকলে উত্তরে বললেন, হাঁ। হুযুর (সাঃ) ফরমান, এটাই স্পষ্ট ঈমান। (মুসলিম-৫৯) আরেকটি হাদিসে দেখা যায়: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, হুযুর (সাঃ) এর নিসকট একজন এসে বলল, আমার মনে এমন সব কল্পনা আসে, তা প্রকাশ করা অপেক্ষা আমি আগুনে জ্বলে কয়লা হয়ে যাওয়া বেশি উত্তম মনে করি। হুযুর (সাঃ) তখন ফরমান, আল্লাহর শোকর তিনি যে একে কুমন্ত্রণার দিক থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। (আবু দাউদ-৬৮) অর্থৎ আল্লা ওইসব সাহাবিদের নিজ করুণায়া নফস এর কুমন্ত্রণা বুঝিয়ে বা চিনিয়ে দিয়েছেন।

নফসই যাবতয়ি অনিষ্টে মুল: আরও একটি বিষয় জানা দরকার। তা হচ্ছে, আল্লাহর সৃষ্টি-জগতে সৃষ্টির আদি থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের যত বিভ্রান্তি, অপমান ধ্বংস, অবনতি, অসম্মান ও আপদ-বিপদ সবার কাছেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। সব অনর্থের গোড়াতে রয়েছে শুধু এ নফসেরই কারসাজি। হয়তো বা এতে কখনো সাহায্য করেছে তারই কতিপয় সাহয্যকারী। তবে মূল অনিষ্টকারী নফসই। প্রথম নাফরমানী প্রকাশিত হয় আল্লাহর প্রতি ইবলিসের মাধ্যমে এর মূলেও সে নফসের অাকাঙ্খারই বাড়াবাড়ি ছিল নফসের হিংসা ও অহঙ্কারই। আশি হাজার বছরের ইবাদতের পরে শয়তানকে নাফরমানীর পাপে লিপ্ত হওয়ার প্ররোচনা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এ নাফরমানীই শয়তানের জন্য চিরস্থায়ী অভিশাপ হয়ে দেখা দেয। অথচ তখন শয়তান ছিল না ও সৃষ্টিজগতও ছিল না। শুধু নফসের অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্যের কারণেই তা ঘটেছিল। এর পর আদম (আঃ) পক্ষ থেকে গুনাহ প্রকাশিত হয়। এক্ষেত্রেও কারণ একই ছিল। তা হলো, নফসের আকাঙ্খার বাড়াবাড়ি, অমর জীবনের প্ররোচণা। এ অমর জীবনের আকাঙ্খার বশবর্তী হয়েই আদম (আঃ) ইবলিসের ধোঁকায় পতিত হলেন। নফস ও তারই সহযোগীদের দ্বারা গুনাহর কাজ আদম (আঃ) কর্তৃক সংঘটিত হলো। ফলে আদম (আঃ)-কে আল্লাহর প্রতিবেশীর মর্যাদা হারাতে হলো এবং তাঁকে বেহেশতের শান্তিপূর্ণ জীবন থেকে বঞ্চিত করা হলো। অতঃপর তাঁকে এ নশ্বর দুনিয়ার অস্থায়ী জীবনে প্রেরণ করা হলো। এভাবেই নফসের একটি মাত্র কামনা পূরণ করতে গিয়ে নিপতিত হলো চিরন্তন পেরেশানীতে আদম (আঃ) নিজে ও তাঁর ভবিষ্যত বংশধরগণ।

একবার কাবিল ও হাবিলের ঘটনার কথাই স্মরণ করে দেখুন, এখানেও মূল অনিষ্টের উৎস নফসই। কারণ, হিংসা ও জিঘাংসা তাদের ঘটনার মূল কারণ ছিল। হারুত-মারুতের কাহিনী স্মরণ করুন। এ ঘটনাও সকল গোলযোগের মূল প্রবৃত্তির কামনাই। মোদ্দকথা, যদি না নফসকে সুনিয়ন্ত্রিত করা যায়, কিয়ামত পর্যন্ত এমনটা ঘটনা চলতে থাকবে অহরহ। আসলে এ জগতে এমন কোন বিভ্রান্তি, গোলযোগ, অঘটন ও গুনাহর কাজ সংঘটিত হয়নি, যার মূলে ছিল না নফস ও তার কামনাসমুহ। এছাড়া গোটা সৃষ্ট-জগত তো আগাগোড়াই উত্তম ও সুস্থতায় পরিপূর্ণ। কাজেই মানুষের সর্বদাই সচেতন থাকা দরকার এবং আল্লাহর নিকট তৌফিক কামনা করে মুকাবিলা করা অবশ্য দায়িত্ব।

নফসের সংশোধন: এখন প্রশ্ন হলো, নফস নামক দুশমনের সংশোধন করা যায়? আগেই বলা হয়েছে, নফসের বিষয়টি খুবই কঠিন এবং ভয়াবহ শত্রুর ন্যায়ই একে সহজে পরাস্ত করা যায়না। কেননা এ নফস সব কিছু বা সমস্ত খারাপ কাজের উৎপত্তিস্থল। বর্ণিত আছে, কোন এক বেদুঈন অপর কোন এক ব্যক্তির মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য দোয়া করে বলেছিল যে, আল্লাহ নফস ব্যতীত তোমার সমস্ত দুশমনকে অপদস্থ করুন। অবশ্যই, নফসকে প্রথম থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাকে একবারও ছেড়ে দেয়া চলবে না। কারণ তাতে অনেক বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। দুটি উপায়ের যে কোন একটি উপায় রয়েছে এ ব্যাপারটা খুবই জরুরী। নেক আমলের মধ্যে যতখানি শক্তি ও ক্ষমতা হয়েছে, তার দ্বারা নফসকে নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনের আওতায় রাখা সম্ভব। অপরদিকে এমনভাবে তাকে দুর্বল ও নিস্তেজ করে রাখতে হবে, যাতে সে বিদ্রোহ করার সুযোগ খুঁজে না পায়। মোদ্দকথা, নফসের সংশোধনের জন্য সর্কতা ও দুরদৃষ্টি খুবই প্রয়োজনীয়। আরও খেয়াল রাখতে হবে, নফস খুবই শক্তিশালী এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিশেষ জানোয়ার। একে বাগে আনা খুবই কঠিন। তবে একে কাবু করতে গভীর চিন্তার প্রয়োজন থাকলেও তা সহজও। নফসকে পরাস্ত করার কৌশল হচ্ছে, তাকে খুব পর্যুদস্ত ও দুর্বল করে ফেলতে হবে। তাহলেই নফস আয়ত্তে থাকবে। সেজন্য বেশি বেশি রোজা করতে হবে। তাই কামেল লোকদের জীবনে দেখা যায়, তারা জীবনের বেশি সময় রোজার মধ্যেই কাটিয়ে দেয়।

বেশি বেশি ইবাদত ও নেক আমল করে তার (নফস) ওপর বোঝা হিসেবে তা চিপিয়ে দিতে হবে। কারণ দুর্বল গাধা ও শক্তিহীণ কোন জানোয়ারের ওপর যখন ক্ষমতার বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেয়া যায়, তখন সে নুয়ে পড়ে। ভাল পরিবেশ অর্থৎ যাদের আমলে খারপ কাজের প্রভাব কম তাদের সংস্পর্শে থাকতে হবে। ব্যাপারটা হল এরকম, অভিজ্ঞ একজন বললেন, ওই পথে যেয়ো না; ওই পথে বিপদ ওৎ পেতে আছে; বা ওই পথে এক বেশ্যা নিজের রূপকে এমনভাবে দেখাচ্ছে যে, তুমি তার রূপে মোহিত হয়ে তোমার আমল নষ্ট করে বসবে। অতএব তুমি বিকল্প পথ ধরে তোমার গন্তব্য স্থানে যাও। এভাবে নফস যেমন আমাদের ধোঁকা দেয় আমাদেরও তেমন নফসকে ধোঁকা দেয়া শিখতে হবে। এটা হলো প্রথমিক স্তরের ধর্মের পথের পথিকের জন্য উত্তম পন্থা।

আর যারা অলিয়ে কামেল তাদের ধোঁকা এড়িয়ে গেলে চলবে না; শয়তান বা নফসের সাথে সামনা সামনি যুদ্ধ করে জয় লাভ করতে হবে। এব্যাপারে আল্লাহর দয়া ও সাহায্য ছাড়া কোনভাবেই নফসে আম্মারার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে জয় লাভ করা সম্ভব হবে না তাই আল্লাহর কাছে সাহয্য পার্থনা করতে হবে। কারণ তার সাহায্য ছাড়া এ নফস অম্মারা অর্থৎ কাম-প্রবৃত্তিকে দমন করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছেন, নফস তো সব সময় মন্দের প্রতিই আকর্ষণ করে-কেবলমাত্র যে নফসের ওপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হয়েছে-তা ব্যতীত (সূরা ইউসুফ:৫৩)। এটাই হলো নফস থেকে বাঁচার পন্থা। আর একটা কথা মনে রাখতে হবে কোন সময়ই অহংকার করা চলবে না। যদি মনে করেন, নফস আপনার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে, এর থেকে কোন বিপদ বা ভয় নেই; তা হলে তা হবে সবচেয়ে বড় ভুল। আকাশের রং যেমন প্রতি ক্ষণে ক্ষণে বদলায় মনের রং ও কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় প্রতি সেকেন্ডেই বদলায়।তার প্রমান হলো এই হাদিসটি দুটি এবং কুরআনের দুটি আয়াত: ১।হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, হুযুর (সাঃ) ফরমান নিশ্চয় শয়তান মানুষেরে রক্ত প্রবাহের শিরায় শিরায় প্রবাহমান থাকে। (বোখারী, মুসলিম-৬৩)। ২। হযরত ইবনে মাউস (রাঃ) বলেন, হুযুর (সাঃ) ফরমান, তোমাদের প্রত্যেকের সাথে একজন জ্বিন বা ফেরেশতাকে অবশ্যই সাথী নিযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, তবে কি আপনার সাথেও। বললেন, হাঁ, আমার সাথেও। তবে আল্লাহ পাক তার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করেছেন। সে (শয়তান) আমার বাধ্য হয়ে গেছে, ফলে সে আমাকে ভাল কাজ ছাড়া কোন হুকুম দেয় না।(মুসলিম-৬২) কুরআনেও সুরা য়ুসুফ এর দুটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে: সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল সে তাহা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিল এবং দরজগুলি বন্ধ করিয়া দিল ও বলিল ‘আইস।’ সে বলিল, ‘আমি আল্লাহর স্মরণ লইতেছি, তিনি আমার প্রভু তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে থাকিতে দিয়াছেন, সীমা লংঘনকারিগণ সফলকাম হয় ন।’(১২:২৩) সেই রমণীতো তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছিল এবং সে-ও উহার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িত যদি না সে তাহার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিত। তাহাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে বিরত রাখিবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখাইয়াছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধ-চিত্ত বান্দাদিগের অন্তর্ভুক্ত।১২:২৪ জুলেখার সৌন্দর্য, যৌবন বা যৌন প্ররোচনা থেকে একমাত্র আল্লাহর সাহায্যেই ইউসুফ (আঃ) বেঁচেছিলেন। তাই সব সময়ই আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। আর বলতে হবে, নফসের হাত থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর; বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তিনিই মূর্তি পূজকের ঘর থেকে ইব্রাহীম (আঃ) কে যেমন ঈমানের সাথে সত্য সরল পথে বের করে এনেছেন, আমাদেরও তেমনি নফসের শত প্রলোভনের মধ্যেও ঈমান আর ভাল আমল সহ বাঁচিয়ে রাখতে পারেন।

ইমাম গাযযালী (র.) রচনা অবলম্বনে।

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*