দুধ | sampadona bangla news
শুক্রবার , ২০ জুলাই ২০১৮

দুধ

গরুর দুধসাদী : বই পড়ে আর টিভি দেখে করমের গরুর ফার্ম করার ইচ্ছা। ডিসকভারি চ্যানেলের সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায় মাইলের পর মাইল জুড়ে হাজার হাজার সাদা-কালো গরু দেখে চোখ চক চক করে উঠে। আবার সিরাজগঞ্জের গরু দেখলেও মন ভরে যায়। পুঁজি যোগার করার জন্য করমের খুব ইচ্ছে বিদেশে যাবে। সেখান থেকে টাকা কামিয়ে দেশে ডেইরি ফার্ম করবে।

হঠাৎ করেই করমের সে সাদ পুরণও হলো। বিয়ে করে জীবনের বিরাট পরিবর্তন আসল। শশুরের টাকায় বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হলো। কিন্তু বিদেশ যেয়ে যে অবস্থায় পড়ল তা বর্ণনাতীত। সব্জি বাগানের কাজ। সে কাজ করতে হয় কোদাল দিয়ে। কোদাল দিয়ে যখন কাজ করে, তখন করম ভাবে হায়রে বিদেশ! আগে ভেবেছি বিদেশে না জানি কত উন্নত কাজ। কারণ যারা বিদেশ থেকে ছুটিতে আসে, তাদের হাতে থাকে সুন্দর-সুন্দর উন্নতামানের লাগেজ। যা সাধারণ মানুষের ধরা ছোয়ার বাইরে। তাই শুধু লাগেজ দেখেই করম মুগ্ধ হতো।

বিয়ের পর বছর খানেক যেতেই শশুর দেখল, তার জামাই কোন কাজেই তেমন এগুতে পারছে না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে জামাই কে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে দিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে জাজিরার কাজ। যাদের মধ্যপ্রাচ্যে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, তারা জানে, মধ্যপ্রাচ্যে সব চেয়ে কঠিক আর কষ্টের কাজ হলো জাজিরার কাজ। কারণ জাজিরার কাজ মানেই থাকতে হয় মরুভূমিতে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, তাই এসিও নেই। নেই ফ্রিজ, তাই ঠান্ডা পনিরও ব্যবস্থা নেই। নেই চলাচলের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা। আমাদের দেশে যেমন কোনখানে যেতে হলে আমরা সহজেই বাসে চড়ে বা ট্রেনে চড়ে যেতে পারি মধ্যপ্রাচ্যে সেরকম কিছু নেই। তাই মধ্যপ্রাচ্যে প্রচন্ড গরমে এসি, ফ্রিজ আর গাড়ি ছাড়া জীবন খুবই কষ্টের।

মরুভুমির তপ্ত আবহাওয়ায় সারা দিন কোদাল দিয়ে কাজ করে রাত্রে শুয়েও মশার কামড়ে সহজে ঘুম আসে  না। সুচের আগার মতো ছোট ছোট মশা যখন কামড়তে আরাম্ভ করে তখন বিদেশের চাকরির উপর বিতৃষ্ণা এসে যায়। তার উপর বিদেশের জাজিরার চাকরিতে আহামরি কোন বেতনও পায় না। যা পায় তা তার নিজের এবং দেশের সংসারেই খরচ হয়ে যায়। রাতে শুয়ে শয়ে শশুর বাড়ির আরাম আয়েশের স্মৃতি মন্থন করত। তখন জিদ আর ক্রোধে নিজে নিজের কপাল চাপড়ায় করম।

যেহেতু করমের কোন পুঁজিই নেই; তাই গরুর ফার্ম করার চিন্তা বাদ দিতে হলো। কারণ তাতে বহু টাকা পুঁজি দরকার। অল্প পুঁজি দিয়ে কি করা যায় তাই শুধু ভাবে করম। ভাবতে ভাবতে স্থির করল দেশে যেয়ে দুধের ব্যবসা করবে। অন্তত ব্যাপারটা ফার্ম রিলেটে হবে। করম দেখেছে, সিরাগঞ্জে মিল্ক ভিটা গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে ফ্যাক্টরি চালায়। করম পরিকল্পনা করল ঢাকায় একটা দোকান নেবে। সেখানে শহরের মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার মহান দায়িত্ব নেবে সে। কারণ ঢাকায় সব কিছুই প্রায় পাওয়া যায় শুধু পাওয়া যায়না খাঁটি দুধ। দোকানে দুধ জ্বাল দিয়ে মানুষকে খাওয়াবে আর একজন্ লোক রেখে বাড়ি বাড়ি কাঁচা দুধ সাপ্লাই দেবে। এটাই অল্প পুঁজি দিয়ে বেশি লাভ করার একটা ভাল উপায় ভাবল করম।

মধ্যপ্রাচ্যে এক ফিলিপিনোর সাথে করমের বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে ছিল ডাইভার কাম মেকানিকস। মরুভূমিতে ড্রাইভাররা বড় অফিসারের মতো। সকলেই সমীহ করে চলে। তাঁর সাথে করমের বন্ধুত্বটা হয়েছিল মানুসিক নৈকট্যের জন্য। ফিলিপিনো ছিল বেশ গম্ভির প্রকৃতির এবং ভাল মানুষ। ন্যয়-নীতি আর নৈতিকতা তাঁর জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল। তাঁকে দুধের ব্যবসার কথা বলাতে সে বলেছিল, ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশে মরণশীল আর পচনশীল জিনিসের ব্যবসা না করাই ভাল। কারণ এইসব দেশে মানুষের জীবনেরই তো দাম নেই। কুকুরের মতো মরে পড়ে থাকে!’ কথাটা অপ্রিয় সত্য, কিন্তু এর অর্থ যে কত বেদনাদায়ক আর কঠিন তা তখন বুজতে না পারলেও দেরিতে বুঝেছিল করম। কিন্তু তখন তার বেশ বড় ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল।

বিদেশে আসার সময় শশুর আকারে ইঙ্গিতে বলেছিল, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চাকরিটা করমের জন্য বিরাট পরীক্ষ।’ যাদি চাকরিটা সে করতে পারে তবে তার পাশ হবে। আর না করতে পারলে অকর্মা বলতে কেউ দ্বিধা করবে না। তাই করমের প্রতিজ্ঞা, যতো কষ্টই হোক জাজিরার এই চাকরিটা তাকে করতেই হবে।

কষ্টের সময় কাটতে চায় না; তবু চাকরির দুই বছর পার হলো। তার কোম্পাদনী বড় এবং পেমেন্ট ভাল। চুক্তিও মেনে চলে। তাদের চুক্তি ছিল দুই বছরে দুই মাস ছুটি দেবে। এবং যাওয়া আসার প্লেনের টিকট দেবে। সেই অনুযায়ী দেশে আসল করম।

দেশে ফিরে সব কিছুই নতুন লাগতে লাগল করমের কাছে। বিশেষ করে দেশের দালান কোটা সব মনে হচ্ছিল পুরান। কারণ দুই বছর মধ্যপ্রাচ্যে ঝক ঝকে রং করা বাড়ি ঘর দেখতে দেখতে অভ্যস্ত চোখ হঠাৎ করে নিয়মিত রং না করা দেশের বাড়ি ঘরগুলো মনে হতে লাগল কতকালের পুরান ঘর বাড়ি বলে। আর একটা ব্যাপার, দেশের সবাই তাকে ভিইপি ভাবছে দেখে বেশ আশ্চার্য লাগছে করমের কাছে। কেননা দেশের এই মানুষগুলো জানে না, বিদেশ বলতে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের মানুষ কি ধরনের কাজ করে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরীক্ষায় পাশ হওয়াতে শশুর করমের উপর খুব সন্তুষ্ট হলো। একান্তে ডেকে তাকে বলল,‘আর বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই। দেশে ব্যবসা বাণিজ্য কিছু করে দাঁড়ানর চেষ্টা কর। আমি পুঁজির ব্যবস্থা করব।’

করম শশুরের কাছে দুধের ব্যবসার কথা উত্থাপন করল। শুশুর পরিকল্পনার কথা শুনে বেশ আশ্চার্য হয়ে বলল, এধনের ব্যবসার কথা আগেতো শুনিনি। পরিকল্পনাটা বেশ নতুন বলে বলে মনে হচ্ছে।’

অবশেষে করম রাজধানীর বেশে গুরুত্বপূর্ণ আর জনবহুল জায়গা, নিউমার্কেটের কাঁচা বাজার সংলগ্ন এলাকায় একটা দোকান পেল। সেখানে বছরের প্রথম দিনই একটা সাইনবোর্ড টানানো হলো। লোকজন বেশ আশ্চার্য হলো। সাইনবোর্ডে ব্যবসার ধরণ দেখে। বিরানির সাথে দুধ। বিরানির আইডিয়াটা নতুন-শশুর দিয়েছে। ব্যাপারটা নিয়ে একটু খোঁজখবর করতে বিরানির রাঁধার একজন বাবুর্চিও পাওয়া গেল। সে রাজধানীর বিখ্যাত প্রখ্যাত বিরানি হাউজের চেয়ে উন্নত না হলেও সমপর্যায়ের বিরানি রাঁধবে বলে দাবি করল। খাঁটি সরিষার তেলের বিরানি।

শিল্প এলাকায় বাবুর্চির নিজের বাড়ি আছে। এখন তার বয়সও বেশ হয়ে এসেছে। তিন বউ। বড় দুই বউ বুড়ি হয়ে গেছে। ছেলে মেয়ে চোদ্দ পনের জন এবং তারা বড়ও হয়ে গেছে। নাম রেখেছে সব তরিতরকারির নামে-ঝিংগে পোটল আলু কদু …….।

ছোট বউ এর বয়স বেশ কম-সে বাড়িতেই হোটেল চালায়। এলাকার শ্রমিকরা সে হোটেলের কাষ্টমার। অল্প পয়সায় পেট ভরে খাওয়া যায়। ভাত যতো খাও সমস্যা নেই। মোটা চালের ভাত, বেশ কম দাম। ডাল ফ্রি। মাছ মাংস যা-ই রাঁধা হয় তুলনামুলক দাম বেশ কম। এর সাথে ছোট বউ এর চটুল চাহনি আর কপোটতার আকর্ষণে খাওয়ার লোকের অভাব হয় না। অন্য কেউ বা বড় বউরা কেউ হোটেলে থাকলে কাষ্টমার বেশ কম হয়। উকি দিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। ব্যাপারটা আন্য কেউ বেশি না বুঝলেও বাবুর্চির অভিজ্ঞ চোখ ঠিকই বুঝতে পারে।

এক বেলা, শুধু দুপুরে হোটেল চালিয়ে প্রায় বিশ পচিশ জনের সংসার চলে যায়। বাবুর্চি শুধু চোখের ইশারায় ছোট বাউকে চালায়।

বড় বউ এর এক মেয়ে সিনেমার নায়িকা হওয়ার জন্য কিছু দিন সিনেমা পাড়ায় পরিচালক প্রযোজকদের পিছনে ঘুরেছে। সে নিজেকে নায়িকা নায়িকা ভাবে। করমকে দেখে তো খুশিতে গদ গদ হয়ে গেল নায়িকা। তার সামনে নাচের ছন্দ থেকে আরাম্ভ করে আরো বহু কিছু অল্প দু-একদিনেই দেখিয়ে ছাড়ল।

নায়িকাদের বাড়িতে একটু ঘন ঘন যাওয়া হচ্ছে করমের। বাবুর্চি নিজের দাম বাড়ানর জন্য, নাকি কোন ফন্দিতে, তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে। তা বুঝতে পারছে না করম। তবে নায়িকার সামনে গেলে করমেরও বেশ নায়ক নায়ক লাগে। একবার ভাবে, দেবদাস হলে মন্দ হয় না!

একদিন বাজিয়ে দেখার জন্য করম সেক্স আর প্রেম নিয়ে নায়িকাকে কিছু বলতে গেল। দেখল, সে যা বলতে চায় নায়িকা তার চেয়ে শত মাইল এগিয়ে। প্রেম ভালবাসার বিষয়ে দারুণ স্পার্ট। এমনকি লিভ টুগেদার করতেও আগ্রহী। বুঝতে পারল এ মেয়েকে কাছে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। তাই বলে নায়িকাকে এ পর্যন্ত তেমন সস্তা বলেও মনে হয়নি করমের। নিজের উচ্চকাঙ্খার জন্য কারো কারো কাছে নিজকে তারা তারি উপস্থাপন করলেও, অনেক কে আবার পাত্তাও দেয় না সে। নায়িকা করমকে বেশ মূল্যায়ন করায় বাবুর্চিও করমকে সমীহ করতে শুরু করেছে। বাবুর্চি মনে হয় মেয়ের রুচিকে বেশ উচু দরেরই জানে। তাই  করমকে আর বেশি আন্ডারস্টিমেট করল না।

করম ভাবতে লাগল বেশ জটিলতায় পড়েছে সে। কারণ তার মূল লক্ষ্য হলো দুধের ব্যবসা। এর মধ্যে শশুরের উপদেশে বিরানি বেঁচতে এসে বাবুর্চির স্মরণাপন্ন হয়েছে। আর বাবুর্চির কাছে এসে ইচ্ছেয় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সে নায়িকার সান্নিধ্যে এসেছে। কেন জানি নায়িকা বেশ সুন্দরী আর আকর্ষণীয় হলেও তার কাছে গেলেই খুব অস্বস্থি লাগে করমের। কারণ লক্ষ্য করেছে নায়িকার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার একটু সুযোগ আর প্রশ্রয়ও ওই বাড়ি থেকে যেন পাওয়া যায়-মনে হয় এটাই অস্বস্থিরতার কারণ। যতোই এ্যাডভান্স হোক রক্ষণশীল চোখে হিসেবে করলে যুবতী একটা মেয়েকে যুবক একজনের কাছে এগিয়ে দেওয়া কোন ভাল কাজ হতেই পারে না। তার সিক্সসেন্স বলছে, ‘করম তুই বিপদে পড়বি। এই মেয়ে তোকে ছিবরে বানিয়ে ছাড়বে।’

একদিন নায়িকা করমকে বলল, ‘চলুন আপনার সাথে সিনেমা দেখব।’ মধ্যপ্রাচ্যে নিত্য-নতুন হিন্দি ছবি দেখতে দেখতে করম আবার বাংলা ছবি একদম সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সে কথা মুখ ফুটে বলতে সাহস হলো না। তবে ভদ্রতার জন্য বলল, ‘আমার তো সময় নেই, বরং আপনি ঝিংগে পটল কাউকে নিয়ে সিনেমা দেখে আসুন। টাকা আমি দিচ্ছ।’ এই বলে পকেট থেকে টাকা বের করে দিল। নায়িকা আবার চুপচাপ টাকা নিয়েও নিল। করম ভেবেছিল আত্মসম্মান বা অহংবোধের জন্য টাকা নেবে না নায়িকা। কিন্তু টাকা নেওয়ায় নায়িকার ব্যাপারে সে আরো সর্তক হলো।

অনেক কষ্টে বাবুর্চিকে বিরানি কাম দুধের দোকানে আনা গেল। তার জন্য নিউমার্কেটের পাশে বস্তিতে একটা থাকার ঘর ভাড়া নিতে হলো। সেখানেও এলাহি কারবার-ডানা কাটা পরীর ছড়াছড়ি। করম ভাবতে লাগল তার চেখের কি দোষ হয়েছে নাকি! বাবুর্চির বাড়িতে নায়িকা, নিউমার্কেটের বস্তিতে ডানা কাট পরী, আর যেকোন মেয়েকে দেখলেই তার কাছে সুন্দরী মনে হয়। ভিতর ভিতর আরো সর্তক হলো করম। কে জেন বলেছিল, ‘মানুষের মস্তিস্ক বিকৃত হলেই কেবল বউ ছাড়া সব মেয়েলোককেই সুন্দরী মনে হয়।’ তবে কি করম চরত্রহীন হয়ে গেছে।

সরিষার তেলের বিরানি, আর দুধের দোকান আরাম্ভ হলো। করম হিসেব কষেছে প্রতিদিন তার দুই আইটেমে দুই হাজার টাকা লাভ হবে। কিন্তু হায়, কোথায় লাভ! কসাই এসে বাবুর্চিকে লম্বা ভক্তি দেখিয়ে হাতের মধ্যে টাকা গুজে দেয়।

অবস্থা দেখে অবসরে কসাইকে ধরল করম। কেন সে বাবুর্চিকে টাকা দেয় জিজ্ঞেস করতে কসাই বলল, ‘আমি যদি বাবুর্চিকে ভক্তি না দেখাই সম্মানি না দেই তবে আমার মাংস চলবে না।’

করম বলল, ‘কিরকম? আমি নগদ টাকা গুনে তোমার কাছ থেকে সরাসরি মাংস কিনছি। আর ভক্তি পাচ্ছে বাবুর্চি। কসাই তখন বলল, বাবুর্চি ইচ্ছে করলে আমার মাংস নেবে না। বলবে, এই  মাংস কাটার দোষ। বিরানিতে আয় হয় না-লস হবে। তখন কি আপনি আমার কাছ থেকে আর মাংস কিনবেন।

করম উপলদ্ধি করল ভাল বেকায়দায় পড়েছে সে। অশিক্ষিত আর স্থুল বুদ্ধির বাবুর্চির কাছে সে এখন জিম্মি। সরিষার তেলের ড্রাম খুলে দেখল প্রায় পাঁচ লিটার তেল হওয়া হয়ে গেছে। বাবুর্চিকে জিজ্ঞেস করায় সে নিজেকে অসম্মানিত মনে করল। এমন গরম চোখে তাকাল, তারাতারি অন্য প্রসঙ্গে যেতে বাধ্য হলো করম। কারণ এই লাইনের কাউকে চেনা না সে। এখন যদি বাবুর্চি চলে যায়, তবে পানিতে পড়বে করম। কোথায় পাবে আরেকজন এমন নামকারা বাবুর্চি! যে নিজের নাম নিজেই বড় করে বাজায়।

২০ কেজির পিতলের বড় ডেগ (পাতিল) কিনে তার মধ্যে তামা দিয়ে কালাই করেছে। খুচরা খরচ তেমন দেখা যায় না। কিন্তু এতো খরচ হয়েছে যে, সব যোগ দিলে যে অঙ্ক দাড়াবে, তা দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যে কামাইও করতে পারেনি করম। শশুরের কাছে চাইতেই টাকা পেয়েছে। আর শশুরও উদার হাতে টাকা দিয়েছে। কিন্তু সব খরচের জিম্মাদার তো সে।

এ অবস্থায় বিরানি চালু করতে করতেই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে লস তো হবেই, সকলের কাছে বেইজ্জতিও কম হবে না। কারণ, করম শশুরের কাছে বড় মুখ করে বলেছে এবং প্রচার করেছে পুরান ঢাকার হাজির বিরানির চেয়েও নিউমার্কেটের সদ্য চালু হওয়া এই বিরানি উৎকৃষ্ট ও নির্ভরযোগ্য। বাবুর্চিও খুব উঁচু দরের বড় এবং ভাল মানুষ। এখন সেই বাবুর্চির এই ছিচকে চোরের স্বভাবের কথা কিভাবে প্রকাশ করবে করম! যার জন্য এখন গোপনে নিজের চুল নিজেরই ছিড়া ছাড়া গতন্তর নেই।

ঢাকার অদুরের দুধের এক বিখ্যাত এলাকা থেকে দুধ কিনে আনা হলো। দোকানের সামনে কেরসিনের চুলা ফিট করে সেই দুধ জ্বাল দেওয়া হলো। কৌতুহুলি লোকজন এসে দুধ খেতে আরম্ভ করল। দুধ খাওয়ার পর কাষ্টমারের মুখের অভিব্যক্তি দেখে করমের খুব একটা ভাল মনে হলো না। বুঝতে পারল যে একবার এই দুধ খাচ্ছে সে আর দ্বিতীয়বার এই দুধ খাবে না। কারণ যে লোক দুধ এনেছে, সে দুধে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে-তবেই এনেছে।

অন্যদিকে আরেক মুশকিল হলো, বাড়ি বাড়ি সাপ্লাই দেওয়ার দুধ; এসিটেন্ট এক লিটার ও বেঁচতে পারেনি। করমের মনে হচ্ছে আধা মন দুধ তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে-আর বলছে, ‘আমাদের কি হবে।’ সারা দিনের ব্যর্থতা কিছুই মনে না করে এসিসটেন্ট বিড়ি ফুকছে, আর গুণ গুণ করে গান গাইছে। মনে হচ্ছে কতই না কামাই করে এসেছে।

রাতে করম তার এসিসটেন্টকে বলল, ‘দুধগুলোকে ছানা করতে।’ এসিটেন্ট লেবুর রস দুধের মধ্যে ছেড়ে দিল, দুধ ছানা হয়ে গেল। কিন্তু ছানা করতে যে দুধ আগে জ্বাল দিতে হয়, তা বেমালুল ভুলে গেল। কাঁচা দুধের ছানা। প্লাস্টিক প্লাস্টি, শক্ত শক্ত মনে হলো।

ছোট বেলায় করম রসগোল্লা বানাতে দেখেছে। স্মৃতি হাতরিয়ে অনুমান করে রসগোল্লা বানাল। দেখতে বেশ ভালই দেখাচ্ছে। বড় বড় রসগোল্পা, এক কড়াই ভর্তি। একটা চেখে দেখতে গিয়ে বোঝা গেল, ভিতরে একটু কাঁচা রয়ে গেছে-তবে তেমন ধর্তব্য না।

রসগোল্লা পাঠানো হলো শশুর বাড়িতে, আর ভায়রা ভাই এর বাড়িতে। ভায়রা রসগোল্লা খেয়ে দুই নম্বর মন্তব্য করাতে, স্বামীর স্ত্রীর তুমুল ঝগড়া বেধে গেল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*