ত্রিপুরায় এবার মুখোমুখি লড়াই ‘লাল' আর ‘গেরুয়া'র | sampadona bangla news
বৃহস্পতিবার , ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ত্রিপুরায় এবার মুখোমুখি লড়াই ‘লাল’ আর ‘গেরুয়া’র

সম্পাদনা অনলাইন : ভারতের যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরাতে বামপন্থীরা গত পঁচিশ বছর ধরে একটানা শাসন করছে, সেখানে এবার তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি ও উপজাতীয় দল আইপিএফটি-র জোট।

ভারতের এই একটিমাত্র রাজ্যে বিজেপি ও কমিউনিস্টদের সরাসরি লড়াই, আর সে কারণেই ত্রিপুরাতে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটা আলাদা মাত্রা পেয়ে গেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগে যে রাজ্যে বিজেপির অস্তিত্ব পর্যন্ত ছিল না, সেখানকার ভোটে কেন তারা এভাবে সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে?

আর ক্ষমতাসীন বামপন্থীরাই বা এই নতুন চ্যালেঞ্জকে কীভাবে দেখছেন? ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় সেটাই দেখতে গিয়েছিলাম সরেজমিনে।

সোমবার রাতে আগরতলা শহরের সূর্য চৌমহনি মোড়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন দিল্লিতে বিজেপি তথা আরএসএসের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা রাম মাধব, যিনি গত ছমাস ধরে ত্রিপুরার মাটি কামড়ে পড়ে।

তিন বছর আগেও বিজেপি এ রাজ্যে ‘অতি দুর্বল একটি শক্তি’ হলেও এবারের নির্বাচনে ষাট আসনের বিধানসভায় অন্তত চল্লিশটি আসন যে তারা পাবেই, সে কথা দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করেন তিনি।

এই স্বপ্নকে সত্যি করতে বিজেপি এবারে ত্রিপুরার মতো ছোট রাজ্যে যে বিপুল অর্থ আর সাংগঠনিক শক্তি ব্যয় করেছে, তা প্রায় নজিরবিহীন। রাম মাধবের এটাও বলতে দ্বিধা নেই, ৩রা মার্চ ভোট গণনার দিনে কমিউনিস্টদের হারাতে পারলে তারা ‘অকাল দীপাবলি’ পালন করবেন।

কিন্তু ভারতের প্রায় সাড়ে পাঁচশো আসনের লোকসভায় যে রাজ্য মাত্র দুজন এমপি পাঠায়, সেই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডটি দখল করার জন্য বিজেপি কেন এতটা মরিয়া?

ক্ষমতাসীন সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য হরিপদ দাস বলছিলেন এর কারণ একটাই – কমিউনিস্টরা ভারতে সঙ্ঘ পরিবারের সবচেয়ে বড় চক্ষুশূল।

তার কথায়, “কমিউনিস্টরা হল তাদের এক নম্বর ঘোষিত শত্রু।”

“এই কারণেই কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ কি অন্ধ্রতে তারা হারল কি জিতল তাতে বিজেপির তেমন কিছু যায় আসে না। কিন্তু এই ত্রিপুরাতে আমাদের হারাতে পারলে তাদের দশটা উত্তরপ্রদেশ জেতার সমান আনন্দ হবে”, বলছিলেন প্রবীণ ওই সিপিএম নেতা।

ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অনিন্দ্য সরকার আবার মনে করেন, বামপন্থী বনাম সঙ্ঘের লাল-গেরুয়া লড়াইয়ের বাইরেও এখানে বিজেপির আরও একটা জিনিস প্রমাণ করার তাগিদ আছে, যে ভারতের সব প্রান্তেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

অধ্যাপক সরকার বলছিলেন, “মতাদর্শগত লড়াইয়ের বাইরেও এটা হল বিজেপির সর্বজনগ্রাহ্যতা পাওয়ার লড়াই। নইলে মাত্র ৩৭ বা ৩৮ লক্ষ জনসংখ্যার একটা রাজ্যে তাদের এতটা বাড়াবাড়ি রকম অর্থ, সম্পদ বা লোকবল খরচ করার আর কোনও ব্যাখ্যা হতে পারে না।”

“আসলে ২০১৪-র পর থেকেই তারা একটি হেজিমোনিক বা আধিপত্যবাদী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। উত্তর ভারত বা গোবলয়ের দল হিসেবে তাদের যে পরিচিতি, সেই গণ্ডী ছাড়িয়ে সারা ভারতেই তাদের মান্যতা আছে এটা বিজেপি প্রমাণ করতে মরিয়া – আর সেখানে ত্রিপুরা তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের একটা বড় ভূমিকা আছে”, বলছিলেন অনিন্দ্য সরকার।

এদিকে বলিউডের একটি আসন্ন সিনেমা – যার নাম ‘লাল সরকার’ – সেটির কথাও ত্রিপুরার নির্বাচনী মরশুমে এখন লোকের মুখে মুখে ফিরছে।

ত্রিপুরার বাম শাসনে কীভাবে মানুষ নির্যাতিত ও অত্যাচারিত, তা নিয়ে তৈরি এই সিনেমার টুকরো টুকরো ছবি এ রাজ্যে হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকে ছেয়ে আছে, আর এর নির্মাতারাও বিজেপির ঘনিষ্ঠ বলেই অভিযোগ।

ওই সিনেমায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর তথাকথিত স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকেও আক্রমণ করা হয়েছে। আর ‘লাল সরকার’ যেটা সিনেমার আড়ালে করছে, ত্রিপুরায় নির্বাচনী প্রচারে এসে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদী কিন্তু সেটাই করেছেন কোনও রাখঢাক না-রেখে।

রাজ্যের কুড়ি বছরের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করে তিনি বলেছেন ত্রিপুরার এবার ‘ভুল মানিক’ থেকে মুক্তি চাই, তার বদলে তাদের দরকার ‘হিরা’ – অর্থাৎ হাইওয়ে, রেল, এয়ারপোর্টের মতো মেগা-অবকাঠামো প্রকল্প।

মজার ব্যাপার হল, সিপিএমের নির্বাচনী প্রচারেও কিন্তু তাদের আক্রমণের প্রধান নিশানা প্রধানমন্ত্রী মোদী। ফাঁকা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে কীভাবে তিনি দেশকে ধোঁকা দিচ্ছেন, বিধানসভা ভোটের প্রচারেও সেটাই তুলে ধরা হচ্ছে।

সিপিএম ভোটের মুখে গান বেঁধেছে, “দেশে জাম্বুরা গাছ রাখত না, কানার হাতে কুড়াল দিও না”! সে গান বাজছে ত্রিপুরার পথে প্রান্তরে, গ্রামে পাহাড়ে। ‘কানা’র হাতে কুড়ুল তুলে দিয়ে এ রাজ্যের মানুষ ত্রিপুরার সাজানো বাগান তছনছ করবে না, তাদের বিশ্বাস সেটাই!

তবে পশ্চিমবঙ্গে চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের শেষ দিকে যেমন মানুষ তিতিবিরক্ত ছিল, অবিকল সেই একই ধরনের কথা কিন্তু ত্রিপুরাতেও আজকাল গরিব মানুষের মুখে শোনা যাচ্ছে।  গোর্খা বস্তি স্ট্যান্ডে অটোচালক তপন আচার্য যেমন বলছিলেন সিপিএমের জুলুমবাজি কেমন অসহ্য হয়ে উঠেছে।

“ওদের মিছিলে না-গেলেই সিন্ডিকেট পাঁচ-সাতদিন গাড়ি আটকে রেখে দেবে। জোর করে ইলেকশনের চাঁদা নিয়েছে আমার কাছ থেকে পাঁচশো টাকা, কারও কাছে থেকে হাজার টাকাও আদায় করেছে। বাড়িতে গিয়ে পরিবারের মেয়েদের পর্যন্ত শাসানি দেয়, এত বড় সাহস ওদের!”

“তারপর ধরুন কোনও অভিযোগ নিয়ে পুলিশে গেলাম। থানার বাবুরা সব শুনে প্রথমেই লোকাল পার্টি অফিসে ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, আমি কাদের লোক? রুলিং পার্টির লোক না-হলে অভিযোগই নেবে না”, রীতিমতো হতাশ গলায় বলছিলেন দরিদ্র ওই অটোচালক। ফলে পঁচিশ বছরের একটানা শাসনের পর বেশ কিছুটা ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ বা শাসক দলের প্রতি বিদ্বেষ বামপন্থীদেরও সামলাতে হচ্ছে।

তার সঙ্গে বিজেপির ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ ত্রিপুরাতে গত পঁচিশ বছরের মধ্যে তাদের যে সবচেয়ে শক্ত লড়াইয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someone

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*