টেলিফোন | sampadona bangla news
বুধবার , ২১ নভেম্বর ২০১৮

টেলিফোন

টেলিফোনকিরো : রাজধানী ঢাকায় একসময় টেলিফোন ছিল সোনার হোরিণের মতো। একটা টেলিফোনের লাইন পেতে এক যুগও পার হয়ে যেত। তার পরও ফোন পাওয়া যেত না। ডিমান্ড নোটের যতো টাকা দিতে হতো তার দশ বিশগুন বেশি টাকা ঘুষ দিয়েও টেলিফোনের লাইন আসতো না।

চকবাজার পাইকারি মুদি দোকান দিয়ে হেকমত বেশ তারা তারিই স্বচ্ছল হয়েছে।  অর্থনীতির টাল মাটাল অবস্থায় সিন্ডিকেটের কারিশমায় সকালে পঞ্চাশ টন ডাল কিনে দেখা যেত বিকেলে কেজি প্রতি দশ বিশ টাকা দাম বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় হেকমতের পয়সা বানাতে বেশি সময় লাগেনি।

এখন তার দরকার একটা টেলিফোনের। তা হলে সে আরো সহজভাবে পয়সা বানাতে পারবে। চাটগাঁয়ের ইম্পর্টারদের সাথে হট লাইন থাকলে আর পায় কে। সড় সড় করে শুধু উঠা আর উঠা। তাই হেকমত উঠে পড়ে লাগল টেলিফোনের জন্য।

হেকমত আলীর চাচা বড় সাংবাদিক। সে স্বয়ং ফোনমন্ত্রীকে ধরল। সাত দিনের মধ্যে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা হয়ে গেল। কিন্তু হায় ডিমান্ড নোট হলে কি হবে। ফোন আর আসছে না। বড় ইঞ্জিনিয়ারের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘ফাইল তার কাছে নেই।’ মন্ত্রী মহোদয়ের সুপারিশ করা ফাইল, তিনি একদিনেই ছেড়ে দিয়েছেন। উপদেশ দিলেন, ‘সেকশানে গিয়ে দেখেন।’ যে এলাকায় টেলিফোন লাগবে সে এলাকার এসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘ফাইল যখন বড় স্যার পাঠিয়েছেন, তখন আর যাবে কোথায়। নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। এক সপ্তাহেই ফোন লেগে যাবে।’ গর্বে হেকমত আলীর বুকটা ফুলে যায়। যে ডিমান্ড নোট হতে বছরের পর বছর লেগে যায়; সেই ডিমান্ড নোট তার চাচার তদবিরে এক সপ্তাহে হয়ে গেছে। টেলিফোন তো পেয়েই গেছে, এখন শুধু লাগতে যা দেরি। আশা করছে আর কোন সমস্যা হবে না।

কিন্তু হায়! কোথায় টেলিফোন! প্রায় বছর ধরে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা ক্ষয় হয়ে গেল, তার পর ও টেলিফোনের কোন দেখা নেই। হেকমতের মনে শুধু, হায় টেলিফোন হায় টেলিফোন!

হঠাৎ একদিন টেলিফোন লাইনে কাজ করে, কেরামতের সাথে দেখা। তাকে ডেকে হেকমত নিজের ডিমান্ড নোট দেখিয়ে বলল, কি কারণে সে টেলিফোন পাচ্ছে না।

কেরামত বলল, ‘স্যার মন্ত্রীবাবু তো সুপারিশ করেই খালাস। আর চিফ ইঞ্জিনিয়ারও তা পাশ করিয়ে দিয়ে শেষ। কিন্তু আমরা যে লাইনটা দেব, সেটা পাব কই।’

হেকমত বলল, ‘মানে।’

তখন কেরামত বলল, ‘স্যার এই এলাকায় নয় হাজার নয়শো নিরানব্বইটা লাইনের ক্ষমতা আছে।’ কিন্তু চাহিদা আছে নিরানব্বই হাজার নয়শো নিরানব্বই জনেরও উপরে। তা হলে আপনি লাইন পাবেন কোথা থেকে।

কেরামত বলল, ‘স্যার আপনার হাতে যদি সময় থাকে তো টেলিফোন নিয়ে একটা গল্প আপনাকে শুনাই, তা হলে আপনার জ্ঞান একটু বাড়বে।’

গল্পটা হলো, প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমল। তিনি প্রেসিডেন্ট ভোট দিয়েছিলেন। প্রায় ডজন খানেক প্রেসিডেন্টপ্রার্থীর মধ্যে একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি প্রেসিডেন্টপ্রার্থী কেন হয়েছেন। মানে আপনার কর্মসূচী কি।’

উত্তরে প্রেসিডেন্টপ্রার্থী বলেছিলেন, টেলিফোন।’

সাংবাদিকরা বলেছিল, মানে’।

উত্তরে প্রেসিডেন্টপ্রার্থী বলল, আমি বহুদিন হলো একটা টেলিফোনের চেষ্টা করছি। কিন্তু লাইন পাইনি। এখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ায় আমাকে দুইটা টেলিফোন দেওয়া হয়েছে। ভোটের মওসুম শেষ হলে তদবির করে একটা টেলিফোন রেখে দেব। যদি তদবিরে না হয় তবে হাত পা ধরে হলেও একটা ফোন রাখব।’

গল্প শুনে হেকমত বলল, ‘তা হলে আমার ডিমান্ড নোটের কি হবে ….।’

কেরামত বলল, আরে রাখেন ডিমান্ড নোট। আপনার মত ডিমান্ড নোট নিয়ে অন্তত কয়েক  হাজার লোক ঘুরছে বছরের পর বছর।’

শুনে হেকমত হতাশ হয়ে পড়ল। ডিমান্ড নোট করার জন্য ঘুরছে লাখ লোক। আর ডিমান্ড নোট করিয়ে তা নিয়ে ঘুরছে হাজার হাজার লোক। তা হলে টেলিফোনের কি হবে।

হেকমত কেরামতকে বলল, ‘তোমার কাছে কোন ব্যবস্থা আছে নাকি।’

কেরামত বলল, ‘ফেল কড়ি মাখো তেল-এই বুদ্ধি ছাড়া আমার কাছে কোন নিদান নেই।’

কত লাগবে জিজ্ঞেস কারায় যে উত্তর শুনল হেকমত, ‘তাতে চমকে না উঠেলেও ভ্রু কুঁচকে উঠল।

হেকমত বলল, ‘এই না বললে, খালি কোন নম্বর নেই। তা হলে টাকা দিলে কোথা থেকে নম্বর দেবে। তখন কেরামত বলল, আরেক জনের নম্বর লগিয়ে দেব।’ শুনে অবাক হয়ে গেল হেকমত।

ব্যাপারটা হলো, কিছু কিছু নম্বর আছে, যাদের অনেক টাকার বিল বকেয়া হয়ে গেছে। কিন্তু তারা বিল ঠিকমতো পরিশোধ করে না। এমন কি ডিমান্ড নোটের জমা টাকার চেয়েও বেশি বিল পাওনা। তাই ওই সব লাইন কেটে দিলে তারা আর টু-টা তেমন করে না। মনে করে নিজের দোষে লাইন কাটা গেছে। আর কি হবে।

হেকমত তখন বলল, ‘ওই সব বকেয়া বিল আমার ঘারে চাববে নাতো।’

কেরামত বলল, ‘চাপতো যদি মন্ত্রীর চাপে আপনার লাইন দিতে হতো তবে। আপনার মন্ত্রী তো বেশি চাপা চাপি করছে না। ওই একদিন সুপারিশ করেই শেষ। তাই আপনার ভয় নেই।’  এখন আমরা যে লাইন দেব সেটা আপনার নতুন ডিমান্ড নোটে হবে। অর্থাৎ বকেয়া সব মুছে যাবে। নতুন কড় কড়ে করেই আপনার ফোন লাগিয়ে দেওয়া হবে।’

অবশেষে রফা হল এবং দুই তিন দিনের মধ্যে ফোনও পাওয়া গেল। যেখানে মন্ত্রীর সুপারিশে বছর ঘুরেও কাজ হলো না; সেখানে পিওন লেবেলের লাইনম্যানের তদবিরে তিন দিনেই কাজ হয়ে গেল। হেকমত নতুন করে চমৎকৃত হলো পিওন-লাইনম্যান আর টাকার কারিশমা দেখে। এইভাবে বাসায়ও টেলিফোন লাগিয়ে নিল হেকমত। কিন্তু এখন আর ল্যান্ড ফোনের কদর নেই।

এখন মোবাইলের যুগ। টোকাই ভিক্ষুক থেকে আরাম্ভ করে প্রত্যন্ত গ্রামের লোকের হাতেও শোভা পায় মোবাইল। কিন্তু এই মোবাইলের যুগের শুরুটা কিন্তু এরকম ছিল না। একট কোম্পানী যখন একচাটিয়া মোবাইলের ব্যবসা করত, তখন লাখ দুই লাখ টাকা দিয়ে মোবাইল পেতো শুধু পাজারু ধাওয়া লোকরা। এর পর যখন কয়েকটা কোম্পানী মোবাইল কোম্পানি খুলল, তথন সিমের দাম পঞ্চাশের ও নীচে নেমে আসল। কোটি কোটি লোকের হাতে এখন ফোন। ফোন আর এখন সোনার হরিণ না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*