কবি শহীদ কাদরী | sampadona bangla news
শুক্রবার , ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

কবি শহীদ কাদরী

শহীদ কাদরিসম্পাদনা অনলাইন : বাংলা ভাষার বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরী গুরুতর অসুস্থ। সোমবার রাত সোয়া তিনটার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে নিউইয়র্কের নর্থ শোর হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলছে।
কবির স্ত্রী নীরা কাদরী বলেন, শহীদ কাদরীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে অ্যাম্বুলেন্সে নর্থ শোর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া হয়।

গত ১৪ আগস্ট একুশে পদকপ্রাপ্ত শহীদ কাদরীর ৭৪ তম জন্মদিন ছিল। সেদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জ্যামাইকার নিজ বাসভবনে ভক্ত-অনুরাগীরা কবিকে ফুল দিয়ে, গান গেয়ে ভালোবাসায় সিক্ত করেন।

শিহাব শাহরিয়ারের ভাষায় : বাংলা কবিতার শক্তিশালী কবি শহীদ কাদরী। রবীন্দ্রনাথ,নজরুল ও তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবের হাত বেয়ে এবং বিভাগোত্তর মধ্য চল্লিশের দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক কবিতার যে চর্চা শুরু হয় তারই পরবর্তী দশকের কাব্য-তুর্কিদের অন্যতম একজন তিনি। অর্থাৎ ১৯৫২ সালের মহান ভাষা-আন্দোলন ও মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে কবিতার যে বাঁক বদল ঘটে, সেই বাঁকের একজন শহীদ কাদরী। তাঁর নাম উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকের সামনে আরো দুজন কবির নাম প্রয়োজনক্রমেই চলে আসে- তারা হলেন কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদ। শহীদ কাদরী নিজেই বলেন,‘পঞ্চাশের কেন,পুরো বাংলা কবিতার প্রধান কবি শামসুর রাহমান।’

ইন্টারনেট থেকে : সতীর্থ আল মাহমুদ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য,‘দারিদ্র্যের কারণে চেতনার বিচ্যুতি ঘটেছে তাঁর। ফলে কবি হিসেবে বড় হয়েও, আর্থিক দৈন্যের কারণে ধীরে ধীরে মৌলবাদীদের ঘরের মানুষ হয়ে গেছেন। অথচ ষাটের দশকে আমরা বেড়ে উঠেছি,তেজি ঘোড়ার মতো সমানে সমান নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলা কবিতার অপরিহার্য তুখোড় কবি শহীদ কাদরীর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার অপরিসীম। তাঁর সান্নিধ্যে এলেই ফেলে আসা বাংলাদেশ, বাংলা কবিতা, বিশ্বসাহিত্য-সমাজ ও মানুষ নিয়ে অনর্গল বলতে শুরু করেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতার বয়ান শোনার আমার প্রথম সুযোগ হলো এবার।  সুযোগটি করে দেন কবি শামস আল মমীন। ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বইমেলা ও বাংলা উৎসবে যোগ দিয়েও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারিনি। নিউ ইয়র্কে বসবাসরত আশির দুই শক্তিশালী কবি শামস আল মমীন ও কবি ফকির ইলিয়াস বললেন, এবার যেন আমি এই সুযোগ হাতছাড়া না করি। তাঁদের দুজনের কথা অনুযায়ী ৩০ মে শহীদ কাদরীকে ফোন করতেই অপর প্রান্ত থেকে ভরাট কণ্ঠে বললেন, ‘কাল বিকেলে চলে এসো, তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হোক, আড্ডা হোক।’

আমি অত্যন্ত উৎসুক হলাম। এখানে একটু বলে রাখি, কবি এখন কিডনি-জনিত জটিল যন্ত্রণায় ডায়ালাইসিস করছেন নিয়মিত। বসবাস করছেন তৃতীয় স্ত্রী নীরা কাদরীর সঙ্গে। বাইরে বের হতে পারেন না তেমন। নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন ২০০৮ সাল থেকে। এর আগে ছিলেন বোস্টনে। সেখানে ছিল তাঁর আমেরিকান দ্বিতীয় স্ত্রী, যার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং স্ত্রী মারাও যান। তাঁর প্রথম স্ত্রী লেখক নাজমুসনেসা পিয়ারী। এর আগে জার্মানে ছিলেন। তারও আগে ছিলেন ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডে আসেন প্রথমে ১৯৭৮ সালে ও পরে ১৯৮২ সালে। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন নিউ ইয়র্কে স্থায়ী হয়েছেন। লিখেন কম। সবাই জানেন, মাত্র তিনটি কবিতাগ্রন্থ নিয়েই বাংলা কবিতায় দাপটের সঙ্গে পথ হাঁটছেন শহীদ কাদরী। আমার মতো বাংলা কবিতার সকল পাঠকই তাঁর কাছে প্রত্যাশা করেন- কবিতা।

প্রত্যাশা পূরণের নিমিত্তে তিনি সম্প্রতি লিখেছেন, ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ নামক চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। কবি শাসম আল মমীন, কবি ফকির ইলিয়াস, কবি তমিজউদ্দিন লোদী, নাট্যজন মুজিব বিন হক ও কবি শহীদ কাদরী- এই পাঁচজন মিলে গঠন করেছেন ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’। বর্তমানে এখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন কবি শাসম আল মমীন, কবি ফকির ইলিয়াস ও মুজিব বিন হক। এঁরা চলে এলেও তিনি প্রতি ত্রৈমাসিক একটি কবিতা সন্ধ্যা করে যাচ্ছেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি কবিতা নিয়ে কথা বলেন, কবিরা স্বরচিত কবিতা পড়েন এবং নির্বাচিত কবিদের কবিতা আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে আবৃত্তি করা হয়। একটি পর্বে আমারও পাঁচটি কবিতা তিনি আবৃত্তিকারদের দিয়ে পড়িয়েছেন। এখনো তিনি নিয়মিত পড়ছেন এবং বাংলা কবিতাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
qudri9
৩১ জুন ২০১৫। সন্ধ্যার লাল আভা ছড়িয়ে আছে বৃষ্টিস্নাত নিউ ইয়র্কের শরীরে। কবি শামস আল মমীন আমাকে তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে বেলরোজের বাড়ি থেকে নিয়ে চললেন কবি শহীদ কাদরীর জ্যামাইকার বাড়ির দিকে। টিপটিপ বৃষ্টির ভেতর গাড়ি থেকে নেমে সোজা উঠে গেলাম ১১ তলার এফ ফ্ল্যাটে। ডোরবেলে চাপ দিতেই দরোজা খুলে দিলেন সেবিকা মেয়েটি। ভিতরে ঢুকেই দেখলাম হাফপ্যান্ট ও হাফশার্ট পরিহিত স্বাস্থ্যবান অসুস্থ মানুষটি হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে ড্রয়িংরুমের বড় সোফায় শুয়ে আছেন। মনে মনে অবাক হয়ে ভাবলাম, নগর ঢাকার দাপুটে, রেস্তোরাঁয় রেস্তোরাঁয় বসে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দেয়া, বিউটি বোর্ডিংয়ের মধ্যমণি বাংলা ভাষার প্রবীণ কবি শহীদ কাদরী এখন নিউ ইয়র্কের এই শীতল ঘরে শুয়ে কী নিস্তেজ এক জীবন কাটাচ্ছেন!

সকলের মতো আমারও প্রশ্ন, কেন তিনি এখানে? তাঁর তো থাকার কথা ঢাকায়? সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়ালাম, তিনি উঠে বসলেন। বললেন, শিহাব কেমন আছো? কবে এসেছ? বেড়াতে এসেছ কি? একসঙ্গে এই তিনটি প্রশ্ন। এই ‘শিহাব’ উচ্চারণ আমাকে মুগ্ধ করল। মনে হলো বহুকাল যাবৎ যেন তিনি আমাকে চেনেন। মনে পড়ল, শামসুর রাহমানের কথা, তিনিও আমাকে একই রকম স্নেহভরে ডাকতেন। মনে হলো, এই আহ্বানে আছে আন্তরিকতা। আমি পাশে বসলাম। শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।
বললাম, নিউ ইয়র্কের আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলায় যোগদান করতে এসেছি।

শুনে বললেন, দেখতেই পাচ্ছ, আমি বেঁচে আছি অসুস্থতার মধ্যে। অত্যন্ত ভারী কণ্ঠে তাঁর এই উচ্চারণ। পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কতগুলো বই বেরিয়েছে?
পনেরোটি। এর মধ্যে কবিতার সাতটি।
তোমার পিএইচডি কী বিষয়ে?
‘বাংলাদেশের কোচ জনগোষ্ঠীর সমাজ ও সংস্কৃতি’।
কোচরা কোন অঞ্চলে বসবাস করে?
বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ওরা বাস করে।
বললেন, ঢাকার পাশে একটি পাহাড়ি অঞ্চল আছে। কী নাম?
মধুপুর।
হ্যাঁ মধুপুর- আমি একবার গিয়েছিলাম।
বললাম, কেন?
গিয়েছিলাম টেলিভিশনের জন্য একটি ডকুমেন্টরি বানাতে। আমি তখন প্রযোজক হিসেবে কাজ করি ঢাকা টেলিভিশনে। ১৯৬৪ সালে টেলিভিশন আনুষ্ঠানিক যাত্রা করবার ছয় মাস আগেই আমি যোগদান করি। মুস্তফা মনোয়ারও তখন প্রযোজক হিসেবে আমার সঙ্গে ছিলেন। কিছু দিন আগে তো বাংলাদেশ টেলিভিশনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো- তাই না?
আমি মাথা নাড়লাম- জি।
অথচ মনে পড়ছে সেদিনের কথা। আমি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত কাজ করেছি টেলিভিশনে। কত অনুষ্ঠান বানিয়েছি- নাটক, শিল্প-সাহিত্যের অনেক অনুষ্ঠান। কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা এসেছে নানা মাত্রিক অনুষ্ঠানে। কলিম শরাফী, শামসুর রাহমানসহ অনেকেই। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানকে ডাকিনি। এ নিয়ে অনেক কষ্ট ছিল তার। পরে একদিন ওর স্ত্রী বলল ডাকার জন্য। তারপর ডেকেছি। আমাদের পরে অনেকেই জয়েন করেছে। আবদুল্লাহ আল মামুন, মুস্তফা কামাল সৈয়দসহ অনেকে। তবে কামাল সৈয়দের মতাদর্শটা মনে হয় বিতর্কিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লোক ছিল মনে হয়। একাত্তরে এবং পঁচাত্তরে তার ভূমিকা ক্ষতিয়ে দেখলে তা ধরা পড়ার কথা। একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড হয়েছিল টেলিভিশনেও। তারপর মনে পড়ে জামিল চৌধুরী কিডন্যাপ হয়েছিল একবার। সাহিত্যিক আনিস চৌধুরীর ছোট ভাই জামিল চৌধুরী- এটি কি তুমি জানো?
জানি না। কেন করেছিল?
ওই প্রমোশন-টমোশনের ব্যাপারে। এই কিডন্যাপের ব্যাপারে আমি খুব উৎসুক ছিলাম। কিডন্যাপের গল্পটা বের করতে পারিনি আজও। মোমেন ঘটনাটা জানত। ও আমেরিকায় আসার পর, ওর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয়নি। শুনেছি ও হাতে লাঠি নিয়ে চলত। নিউ ইয়র্কে ওর বাসা, আমার বাসা থেকে অনেক দূরে। টেলিফোনে কথাবার্তা হয়েছে বহুবার কিন্তু কিডন্যাপের বিষয়টি নিয়ে কখনো কথা বলেনি।

যাহোক, তারপর আমি আমার বড় ভাইকে বলে চাকরি ছেড়ে দিলাম। অন্যত্র যোগদান করলাম। এরপর টেলিভিশনে প্রোগ্রাম করতে যেতাম, তাতে অনেকেই সমালোচনার চোখে তাকাতেন। বলতেন, চাকরি শেষে আবার প্রোগ্রাম করতে আসি কেন- এ রকম গুঞ্জনে আর যাইনি। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আমি আবারও চাকরি ছেড়ে দিই। কিছুদিন পর চলে আসি বিদেশ-বিভূঁইয়ে। এ এক ক্লান্তিহীন যাত্রা।
শহীদ কাদরী এ পর্যায়ে এসে একটু থামলেন। এরপর শাওয়ার নিতে গেলেন। ফিরে আসতে বেশি সময় নিলেন না তিনি। এসেই বললেন, শোনো, বাংলাদেশের কবিতার প্রধান কবি শামসুর রাহমান, অন্য কেউ নয়। দীর্ঘ যাত্রায় তিনি বাংলা কবিতাকে নিয়ে গেছেন এক উচ্চ মাত্রায়- এ কথা কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক। আবারও বলি, আল মাহমুদ কবি হিসেবে বড় কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে বারবার হোঁচট খেয়েছে চেতনার কাছে। তাঁর বর্তমান জামায়াতি অবস্থান তাঁর বড়ত্বকে খর্ব করেছে। আমি এই দুজনের কিছুটা পরে হয়েও পাশাপাশি হেঁটেছি। সে সময়ের অনেক কথা ও গল্প মনে পড়ে।

বললেন, সানাউল হক কবি হিসেবে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সিকান্দার আবু জাফর ‘সংগ্রাম চলবেই’ ছাড়া আর কোনো ভালো কবিতা তো লিখতেই পারেননি। হাসান হাফিজুর রহমান ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি ভালো কবিতা লিখেছে, তারও বাকি কবিতা আমার ভালো লাগে না। আবুবকর সিদ্দিক কবিতার চেয়ে কথাশিল্পে ভালো। আবদুল গনি হাজারীর কিছু কবিতা টিকবে, দিলয়ারও কিছু কবিতা লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক লেখক হিসেবে বড় কিন্তু মন ছোট। বেলাল চৌধুরী তো কবিতা লিখতেই পারলেন না আজও। ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু কবি হিসেবে ওকে আমি ঠাঁই দিতে পারিনি। ফরহাদ মাজহার কিছু ভালো কবিতা লিখলেও সে আল মাহমুদের পথে চলে গেছে। কবি ও লেখকদের প্রগতিশীল হতে হয়। এ কথা ঠিক, কবি ও লেখকরা কখনো কখনো বিভিন্ন মতবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

একটু থেমে আবার শুরু করলেন তিনি। আসলে হয় কি, শিল্প-সাহিত্যের জগতে একটা প্রবলেম হয়ে যায়। প্রবলেমটা হয়ে যায়, যে তোমার, যেটা ইউরোপ-আমেরিকায় দেখা গেছে- অনেক লেখকই ফ্যাসিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন নানা কারণে। ফ্যাসিজমের দর্শনটা অনেক সময় আকর্ষণ করে রাইটারদের। মেধাবী মানুষের শাসনে বিশ্বাস করে ফ্যাসিবাদ। কিন্তু নাৎসিবাদ আর ফ্যাসিবাদ কিন্তু এক জিনিস না। জার্মানিতে নাৎসিবাদের মূল কথা হলো, আর্যদের শাসন থাকবে অনার্যদের ওপর। ইহুদিরা আর্য বা অনার্য না, এই ইহুদিদের শেষ করতে চেয়েছিল ওরা। ভয়াবহ একটা জিনিস নাৎসিবাদী দর্শন। আর ফ্যাসিবাদ মনে করে অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের সিম্বল হলো এ রকম, ধরো অনেকগুলো বাঁশের কঞ্চিকে একটা কুড়াল দিয়ে কেটে ফেলা যায়। এই কুড়ালটা হচ্ছে মেধা, মেধাবী ব্যক্তি ক্ষমতা; জনগণের ক্ষমতার চেয়ে বেশি শক্তি ধারণ করে। অর্থাৎ মেধাই পৃথিবীকে শাসন করে। এজন্যই অনেকেই ফ্যাসিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

একদম প্রথম যখন ফ্যাসিবাদের সূচনা হয়। যখন ফ্যাসিবাদ জার্মানিতে নাৎসিবাদে ঘুরে গেল, তখন কোনো কোনো লেখক নাৎসিবাদে বিশ্বাসী হয়েছেন। যেমন, এজরা পাউন্ডকে তো বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হলো এবং পরে তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয় এবং তার ইন্টারভিউ করা হয়। তখন দেখা গেল, সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। তারপর তাকে ওয়াশিংটনে একটি মেন্টাল হসপিটালে লক ইউনিটে বন্দি করে রাখা হয় এবং প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর সেখানেই ছিল। পরে আমেরিকার বড় বড় কবিরা (যেমন রবার্ট ফ্রস্ট) আবেদনের মাধ্যমে তাকে বের করে পাঠিয়ে দেন ইতালির রোমে। পাঠাবার আগে তাকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি বিখ্যাত পুরস্কার ‘গোগেনহাইম পোয়েট্রি অ্যাওয়ার্ড’ দেয়া হয়।

অনেকে প্রতিবাদ করেছেন, কেন তাকে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে? সে অতীতে মুসোলিনির পক্ষে রেডিওতে ফ্যাসিবাদের প্রচার করেছে! কিন্তু পুরস্কার দেয়ার পক্ষের ব্যক্তিরা বললেন যে, তিনি হলেন একজন মেজর লেখক এবং তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ক্রিয়েটর অব মডার্ন পোয়েট্রি এবং তার কবিতাতে কোনো ফ্যাসিবাদ নেই। পাশাপাশি অতীত থেকে বর্তমানের অনেক লেখকের লেখায় কিন্তু ফ্যাসিজমের গন্ধ পাওয়া যায়। কলকাতাতে বুদ্ধদেবের শেষ জীবনে ‘ভগবান ও ভগবান’ করতে করতে মুখে ফেনা উঠে গেছে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সব সময়ই তোমার ভগবানে বিশ্বাসী লোক। শীর্ষেন্দু সন্ন্যাসী নকুলের শিষ্য। আর আমাদের লেখকদের মধ্যে অনেকে জামায়াতে ইসলামী না, কিন্তু ধর্মে বিশ্বাস করে।

সিকদার আমিনুল হককে দেখেছি আমি, সব সময়ই সে নাস্তিক ছিল। তারপর হার্টে বাইপাস সার্জারি হলো। আমেরিকাতে এলো। হীরা মানে বদরুদ্দিন উমর আর ও উঠল একই কামরায়। আমি গেছি ওখানে আড্ডা দিতে। বদরুদ্দিন উমর ওখানে বসা, সিকদার আমিনুল হক বলল, দাঁড়ান শহীদ ভাই, আমি নামাজটা পড়ে নিই। দেখি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে! দেখে আমি আর কিছু বললাম না, বুঝলাম যে মৃত্যুভয় এসেছে। তো এখন আমাদের সবাই যে নাস্তিক হবে, সবাই যে ধার্মিক হবে না, এমন তো কোনো কথা নেই। তবে ধার্মিক হলেই যে তাকে ‘রাজাকার’ বলতে হবে এটাও ঠিক না।

আল মাহমুদের ব্যাপারটা হচ্ছে কি- টাকা। অলওয়েজ মানি। আল মাহমুদকে যদি মফিদুল হকরা টেনে আনত, যদি ওর একটা চাকরির ব্যবস্থা করত, দৈনিক বাংলায় কিংবা বাংলা একাডেমিতে, ও যেত না জামাতে ইসলামীতে- আমি জানি সেটা। অলওয়েজ তার টাকা দরকার। ইত্তেফাকে প্রুফরিডারি করত, বাংলা একাডেমিতে প্রুফরিডারি করেছে। কেউ তাকে চাকরি দেয়নি। কারণ সে জাসদ করত, যখন তাকে গণকণ্ঠের দায়িত্ব নিতে বলা হলো, তখন সে নিলো। অথচ সারা জীবনই সে প্রুফরিডারি করেছে। আমি নিজে চাকরি পাইনি। ওর ভিতরের ব্যাপারটা আমি জানি তো। সারা জীবন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কলসিতে করে জিয়ল, কৈ আর মাগুর মাছ পাঠিয়েছে, সে মাগুর মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছে। তার কাছে পাঁচটার বেশি কিংস্টার সিগারেট থাকত না। এর বেশি সে কিনতে পারত না। তাঁকে যখন সৈয়দ আলী আহসান বাংলা একাডেমিতে চাকরি দিল, ওই আবার প্রুফরিডারের জব।

তারপর মারধোর খেলো, মারধোর খেয়ে জেলে গেল। জেল থেকে বের হলে গিয়াস কামাল চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে ধরে ওকে শিল্পকলা একাডেমীতে আনল এবং শিল্পকলা থেকে রিটায়ার্ড করল। রিটায়ার্ড করার পর কী করবে? তার তো মাসে মাসে টাকা দরকার? চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে। তখন তাঁকে টোপ দিলো জামায়াতে ইসলামী। যে আল মাহমুদকে নিয়ে গেল, তার নামটা মনে পড়ছে না, সিলেট বাড়ি, রফিক আজাদের ক্লাসমেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরে ছিল, কবি আবুল…আবুল…কী জানি নামটা? আজকাল মনেও থাকে না, আমি তাকে চিনি…এনিওয়ে… সে আল মাহমুদকে সিলেট নিয়ে গেল, সেখানে জামায়াতে ইসলামীতে তাকে রিক্রুট করে নিল। তারপর কী করল, আল মাহমুদের কাব্যসংগ্রহ বের করে দিল এবং ২৫ হাজার টাকা সম্মানী দিল। তারপর যুক্ত করে দিল তাদের পত্রিকার সঙ্গে। এই হলো আল মাহমুদের জামায়াতি হবার নেপথ্য কথা।

আমরা এখানে তোমার নির্বাচিত কবিতার ‘ফড়িঙের পাখা পোড়ে’ কাব্যগ্রন্থের পাঁচটি কবিতা পড়িয়েছি আমাদের ত্রৈমাসিক ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠানে। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোতে পঠিত সব কবিতাই এখন ইউটিউবে দিচ্ছি। তোমার কবিতাগুলোও শোনা যাবে ইউটিউবে।
আমি বললাম, এটি আমার জন্যে সত্যি আনন্দের খবর, কাদরী ভাই।
না না ঠিক আছে, তোমার কবিতা তো ভালো, আর ভালো কবিতা বৃহত্তর পাঠকের কাছে যাওয়া উচিত।

তুমি তো ঢাকায় ফিরে যাচ্ছ, যাও। টেলিফোনে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ হবে। তোমার ফোনে কি ভাইবার আছে?
বললাম, আছে।
তাহলে ভাইবারে কথা বলব। শোনো, ইউপিএল থেকে আমার সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করেছিল। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে কাইয়ুম চৌধুরী, আবুল হাসনাতও যোগাযোগ করেছিল। হাসনাত বলেছিল, নতুন কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি দিতে। বলেছি, নতুন কবিতার পাণ্ডুলিপি দেয়া সম্ভব নয়। পরে বলল, শ্রেষ্ঠ কবিতা করতে চায়। বললাম, আমার সব কবিতাই শ্রেষ্ঠ। কাজেই শ্রেষ্ঠ কবিতাও করতে চাই না।

শোনো শিহাব, আমার শরীর যদি সায় দেয়, আমি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা নিয়ে একটি সংকলন করতে চাই। আসলে এই কাজটি শামসুর রাহমানের করার কথা ছিল। এখন সিনিয়র হিসেবে আমাকেই করতে হবে।
বললাম, সৈয়দ শামসুল হক আছেন, আল মাহমুদ আছেন?
হক করবেন না, আর মাহমুদকে দিয়ে সম্ভব না। তা ছাড়া ও এখন জামায়াতপন্থি মানুষ। কাজেই আমিই এটি করব, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে।
বললাম, কোন দশক পর্যন্ত কবিদের রাখবেন?
শূন্য দশক পর্যন্ত।
দ্বিতীয় দশকেরও তো কয়েকজন ভালো লিখছে।
ওদের আমি চিনি না, এদের কবিতা তাহলে তোমাকেই জোগাড় করে দিতে হবে। আমরা চল্লিশের আবুল হোসেন, আহসান হাবীব থেকে দ্বিতীয় দশকের কয়েকজনের কবিতা নিয়ে এই সংকলনটি তাহলে করব। একটা বিষয় মনে রেখো, অগ্রজদের বেশি কবিতা থাকবে আর নতুনদের তুলনায় কম। তবে ভালো কবিতা বাছতে একটু সময় লাগবে। যেমন ধরো তোমার কবিতা। তোমার একটি মাত্র কবিতার বই আমার হাতে ছিল। সেখান থেকে আমি পাঁচটি ভালো কবিতা পেয়েছি অথচ তোমার কবিতার বই বেরিয়েছে সাতটি। সুতরাং যাদের কবিতা আমরা নেব, তাদের একাধিক কবিতা আমাদের জোগাড় করতে হবে। আমার কাছে অবশ্য প্রবীণ ও বয়স্কদের অনেকের কবিতাই আছে, নতুনদের বেশি বেশি কবিতা আমার কাছে পাঠাও।

বললাম, ঠিক আছে। তবে প্রথমেই নতুনদের একটি তালিকা আপনাকে পাঠাচ্ছি।
হ্যাঁ, তুমি তালিকা পাঠাও, সেই তালিকা থেকে আমি নির্ধারণ করে দেব, কাকে কাকে নেয়া যায়। হুমায়ুন আজাদ, রফিকউল্লাহ খান, সাজ্জাদ শরিফসহ যারা বাংলাদেশের কবিতার সম্পাদনা করেছেন, তাদের সবগুলোই প্রায় আমি দেখেছি।
বললাম, আশি, নব্বই ও শূন্য দশকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলাদা আলাদা সংকলন হয়েছে কাদরী ভাই।
আমি ওগুলো এখনো দেখিনি, তুমি ঢাকায় গিয়ে আমার কাছে পাঠাও- আমি দেখব এবং সব কবিতা পড়ব।

কবিতা নেয়ার ক্ষেত্রে তোমাকে বলি, যেমন বুদ্ধদেব বসু তাঁর সংকলনে পঞ্চাশের দু-একজনকে নিয়েছিল। আমিও সে রকমভাবে দ্বিতীয় দশকের দু-একজনকে নেব। তবে কতজন নেব তা এই মুহূর্তেই বলা যাচ্ছে না। আমার কাছে ধরো, পঞ্চাশ ও ষাট দশকের প্রায় সবার কবিতাই আছে। চল্লিশের আহসান হাবীব আছে, আবুল হাসানের কবিতাসমগ্র আমার কাছে নেই। ওর সমগ্রসহ বাকি নতুনদের সব কবিতা তুমি জোগাড় করে দেবে আমাকে।
বললাম,wR¡।
অনেক ভালো কবিতাও অনেক সময় নেয়া যায় না। কারণ আমাদের সমাজ এখনো অনেকটা রক্ষণশীল। যদিও বাংলা কবিতা এগিয়েছে অনেক দূর। তবু ওসব মাথায় রেখে কবিতা বাছাই করতে হবে। সিনিয়রদের একটু বেশি কবিতা নেব আর জুনিয়রদের কম। কাজটি সময় নিয়ে এবং সুন্দর করে করতে হবে। আর এটি প্রকাশ করার জন্য ঢাকার যে প্রকাশনা সংস্থা রাজি হবে, আশা করি, তাদের সঙ্গে কথা বলে সংকলনের কলেবর ঠিক করা যাবে।

এটুকু বলেই কথা আপাতত শেষ করলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। তখন সন্ধ্যা শেষে রাত নেমেছে নিউ ইয়র্কে এবং বাইরে বজ্রবৃষ্টি হচ্ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে থেমে গেছে। তিনি একটি কলম চেয়ে নিয়ে বললেন, নীরা, আমার নির্বাচিত সাক্ষাৎকার গ্রন্থটি শিহাবকে এক কপি দিতে চাই। নীরা কাদরী বইটি এনে দিলেন তাঁর হাতে। বইটির নাম ‘আলাপে আড্ডায় শহীদ কাদরী : নির্বাচিত সাক্ষাৎকার’। নিজ হাতে লিখে দিলেন- ‘শিহাব শাহরিয়ার, অনুজ প্রতিমেষু, শহীদ কাদরী, নিউ ইয়র্ক’।
আমিও আমার সপ্তম কবিতার বই ‘খড়ের খোঁয়াড়’ তাঁর হাতে দিলাম। তিনি খুশি হয়ে বললেন, আমি পড়ব।
বললাম, এবার আসি?
বললেন, এসো, আবার দেখা হবে, ভালো থেকো।
আপনিও ভালো থাকবেন।

এ এক ক্লান্তিহীন যাত্রা : শহীদ কাদরী

শিহাব শাহরিয়ারের ভা্ষায় : বাংলা কবিতার শক্তিশালী কবি শহীদ কাদরী। রবীন্দ্রনাথ,নজরুল ও তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবের হাত বেয়ে এবং বিভাগোত্তর মধ্য চল্লিশের দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক কবিতার যে চর্চা শুরু হয় তারই পরবর্তী দশকের কাব্য-তুর্কিদের অন্যতম একজন তিনি। অর্থাৎ ১৯৫২ সালের মহান ভাষা-আন্দোলন ও মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে কবিতার যে বাঁক বদল ঘটে, সেই বাঁকের একজন শহীদ কাদরী। তাঁর নাম উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকের সামনে আরো দুজন কবির নাম প্রয়োজনক্রমেই চলে আসে- তারা হলেন কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদ। শহীদ কাদরী নিজেই বলেন,‘পঞ্চাশের কেন,পুরো বাংলা কবিতার প্রধান কবি শামসুর রাহমান।’

সতীর্থ আল মাহমুদ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য,‘দারিদ্র্যের কারণে চেতনার বিচ্যুতি ঘটেছে তাঁর। ফলে কবি হিসেবে বড় হয়েও, আর্থিক দৈন্যের কারণে ধীরে ধীরে মৌলবাদীদের ঘরের মানুষ হয়ে গেছেন। অথচ ষাটের দশকে আমরা বেড়ে উঠেছি,তেজি ঘোড়ার মতো সমানে সমান।’

নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলা কবিতার অপরিহার্য তুখোড় কবি শহীদ কাদরীর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার অপরিসীম। তাঁর সান্নিধ্যে এলেই ফেলে আসা বাংলাদেশ, বাংলা কবিতা, বিশ্বসাহিত্য-সমাজ ও মানুষ নিয়ে অনর্গল বলতে শুরু করেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতার বয়ান শোনার আমার প্রথম সুযোগ হলো এবার।  সুযোগটি করে দেন কবি শামস আল মমীন। ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বইমেলা ও বাংলা উৎসবে যোগ দিয়েও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারিনি। নিউ ইয়র্কে বসবাসরত আশির দুই শক্তিশালী কবি শামস আল মমীন ও কবি ফকির ইলিয়াস বললেন, এবার যেন আমি এই সুযোগ হাতছাড়া না করি। তাঁদের দুজনের কথা অনুযায়ী ৩০ মে শহীদ কাদরীকে ফোন করতেই অপর প্রান্ত থেকে ভরাট কণ্ঠে বললেন, ‘কাল বিকেলে চলে এসো, তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হোক, আড্ডা হোক।’

আমি অত্যন্ত উৎসুক হলাম। এখানে একটু বলে রাখি, কবি এখন কিডনি-জনিত জটিল যন্ত্রণায় ডায়ালাইসিস করছেন নিয়মিত। বসবাস করছেন তৃতীয় স্ত্রী নীরা কাদরীর সঙ্গে। বাইরে বের হতে পারেন না তেমন। নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন ২০০৮ সাল থেকে। এর আগে ছিলেন বোস্টনে। সেখানে ছিল তাঁর আমেরিকান দ্বিতীয় স্ত্রী, যার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং স্ত্রী মারাও যান। তাঁর প্রথম স্ত্রী লেখক নাজমুসনেসা পিয়ারী। এর আগে জার্মানে ছিলেন। তারও আগে ছিলেন ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডে আসেন প্রথমে ১৯৭৮ সালে ও পরে ১৯৮২ সালে। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন নিউ ইয়র্কে স্থায়ী হয়েছেন। লিখেন কম। সবাই জানেন, মাত্র তিনটি কবিতাগ্রন্থ নিয়েই বাংলা কবিতায় দাপটের সঙ্গে পথ হাঁটছেন শহীদ কাদরী। আমার মতো বাংলা কবিতার সকল পাঠকই তাঁর কাছে প্রত্যাশা করেন- কবিতা।

প্রত্যাশা পূরণের নিমিত্তে তিনি সম্প্রতি লিখেছেন, ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ নামক চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। কবি শাসম আল মমীন, কবি ফকির ইলিয়াস, কবি তমিজউদ্দিন লোদী, নাট্যজন মুজিব বিন হক ও কবি শহীদ কাদরী- এই পাঁচজন মিলে গঠন করেছেন ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’। বর্তমানে এখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন কবি শাসম আল মমীন, কবি ফকির ইলিয়াস ও মুজিব বিন হক। এঁরা চলে এলেও তিনি প্রতি ত্রৈমাসিক একটি কবিতা সন্ধ্যা করে যাচ্ছেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি কবিতা নিয়ে কথা বলেন, কবিরা স্বরচিত কবিতা পড়েন এবং নির্বাচিত কবিদের কবিতা আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে আবৃত্তি করা হয়। একটি পর্বে আমারও পাঁচটি কবিতা তিনি আবৃত্তিকারদের দিয়ে পড়িয়েছেন। এখনো তিনি নিয়মিত পড়ছেন এবং বাংলা কবিতাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

৩১ জুন ২০১৫। সন্ধ্যার লাল আভা ছড়িয়ে আছে বৃষ্টিস্নাত নিউ ইয়র্কের শরীরে। কবি শামস আল মমীন আমাকে তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে বেলরোজের বাড়ি থেকে নিয়ে চললেন কবি শহীদ কাদরীর জ্যামাইকার বাড়ির দিকে। টিপটিপ বৃষ্টির ভেতর গাড়ি থেকে নেমে সোজা উঠে গেলাম ১১ তলার এফ ফ্ল্যাটে। ডোরবেলে চাপ দিতেই দরোজা খুলে দিলেন সেবিকা মেয়েটি। ভিতরে ঢুকেই দেখলাম হাফপ্যান্ট ও হাফশার্ট পরিহিত স্বাস্থ্যবান অসুস্থ মানুষটি হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে ড্রয়িংরুমের বড় সোফায় শুয়ে আছেন। মনে মনে অবাক হয়ে ভাবলাম, নগর ঢাকার দাপুটে, রেস্তোরাঁয় রেস্তোরাঁয় বসে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দেয়া, বিউটি বোর্ডিংয়ের মধ্যমণি বাংলা ভাষার প্রবীণ কবি শহীদ কাদরী এখন নিউ ইয়র্কের এই শীতল ঘরে শুয়ে কী নিস্তেজ এক জীবন কাটাচ্ছেন!

সকলের মতো আমারও প্রশ্ন, কেন তিনি এখানে? তাঁর তো থাকার কথা ঢাকায়? সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়ালাম, তিনি উঠে বসলেন। বললেন, শিহাব কেমন আছো? কবে এসেছ? বেড়াতে এসেছ কি? একসঙ্গে এই তিনটি প্রশ্ন। এই ‘শিহাব’ উচ্চারণ আমাকে মুগ্ধ করল। মনে হলো বহুকাল যাবৎ যেন তিনি আমাকে চেনেন। মনে পড়ল, শামসুর রাহমানের কথা, তিনিও আমাকে একই রকম স্নেহভরে ডাকতেন। মনে হলো, এই আহ্বানে আছে আন্তরিকতা। আমি পাশে বসলাম। শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।
বললাম, নিউ ইয়র্কের আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলায় যোগদান করতে এসেছি।

শুনে বললেন, দেখতেই পাচ্ছ, আমি বেঁচে আছি অসুস্থতার মধ্যে। অত্যন্ত ভারী কণ্ঠে তাঁর এই উচ্চারণ। পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কতগুলো বই বেরিয়েছে?
পনেরোটি। এর মধ্যে কবিতার সাতটি।
তোমার পিএইচডি কী বিষয়ে?
‘বাংলাদেশের কোচ জনগোষ্ঠীর সমাজ ও সংস্কৃতি’।
কোচরা কোন অঞ্চলে বসবাস করে?
বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ওরা বাস করে।
বললেন, ঢাকার পাশে একটি পাহাড়ি অঞ্চল আছে। কী নাম?
মধুপুর।
হ্যাঁ মধুপুর- আমি একবার গিয়েছিলাম।
বললাম, কেন?
গিয়েছিলাম টেলিভিশনের জন্য একটি ডকুমেন্টরি বানাতে। আমি তখন প্রযোজক হিসেবে কাজ করি ঢাকা টেলিভিশনে। ১৯৬৪ সালে টেলিভিশন আনুষ্ঠানিক যাত্রা করবার ছয় মাস আগেই আমি যোগদান করি। মুস্তফা মনোয়ারও তখন প্রযোজক হিসেবে আমার সঙ্গে ছিলেন। কিছু দিন আগে তো বাংলাদেশ টেলিভিশনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো- তাই না?
আমি মাথা নাড়লাম- জি।
অথচ মনে পড়ছে সেদিনের কথা। আমি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত কাজ করেছি টেলিভিশনে। কত অনুষ্ঠান বানিয়েছি- নাটক, শিল্প-সাহিত্যের অনেক অনুষ্ঠান। কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা এসেছে নানা মাত্রিক অনুষ্ঠানে। কলিম শরাফী, শামসুর রাহমানসহ অনেকেই। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানকে ডাকিনি। এ নিয়ে অনেক কষ্ট ছিল তার। পরে একদিন ওর স্ত্রী বলল ডাকার জন্য। তারপর ডেকেছি। আমাদের পরে অনেকেই জয়েন করেছে। আবদুল্লাহ আল মামুন, মুস্তফা কামাল সৈয়দসহ অনেকে। তবে কামাল সৈয়দের মতাদর্শটা মনে হয় বিতর্কিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লোক ছিল মনে হয়। একাত্তরে এবং পঁচাত্তরে তার ভূমিকা ক্ষতিয়ে দেখলে তা ধরা পড়ার কথা। একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড হয়েছিল টেলিভিশনেও। তারপর মনে পড়ে জামিল চৌধুরী কিডন্যাপ হয়েছিল একবার। সাহিত্যিক আনিস চৌধুরীর ছোট ভাই জামিল চৌধুরী- এটি কি তুমি জানো?
জানি না। কেন করেছিল?
ওই প্রমোশন-টমোশনের ব্যাপারে। এই কিডন্যাপের ব্যাপারে আমি খুব উৎসুক ছিলাম। কিডন্যাপের গল্পটা বের করতে পারিনি আজও। মোমেন ঘটনাটা জানত। ও আমেরিকায় আসার পর, ওর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয়নি। শুনেছি ও হাতে লাঠি নিয়ে চলত। নিউ ইয়র্কে ওর বাসা, আমার বাসা থেকে অনেক দূরে। টেলিফোনে কথাবার্তা হয়েছে বহুবার কিন্তু কিডন্যাপের বিষয়টি নিয়ে কখনো কথা বলেনি।

যাহোক, তারপর আমি আমার বড় ভাইকে বলে চাকরি ছেড়ে দিলাম। অন্যত্র যোগদান করলাম। এরপর টেলিভিশনে প্রোগ্রাম করতে যেতাম, তাতে অনেকেই সমালোচনার চোখে তাকাতেন। বলতেন, চাকরি শেষে আবার প্রোগ্রাম করতে আসি কেন- এ রকম গুঞ্জনে আর যাইনি। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আমি আবারও চাকরি ছেড়ে দিই। কিছুদিন পর চলে আসি বিদেশ-বিভূঁইয়ে। এ এক ক্লান্তিহীন যাত্রা।

শহীদ কাদরী এ পর্যায়ে এসে একটু থামলেন। এরপর শাওয়ার নিতে গেলেন। ফিরে আসতে বেশি সময় নিলেন না তিনি। এসেই বললেন, শোনো, বাংলাদেশের কবিতার প্রধান কবি শামসুর রাহমান, অন্য কেউ নয়। দীর্ঘ যাত্রায় তিনি বাংলা কবিতাকে নিয়ে গেছেন এক উচ্চ মাত্রায়- এ কথা কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক। আবারও বলি, আল মাহমুদ কবি হিসেবে বড় কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে বারবার হোঁচট খেয়েছে চেতনার কাছে। তাঁর বর্তমান জামায়াতি অবস্থান তাঁর বড়ত্বকে খর্ব করেছে। আমি এই দুজনের কিছুটা পরে হয়েও পাশাপাশি হেঁটেছি। সে সময়ের অনেক কথা ও গল্প মনে পড়ে।

বললেন, সানাউল হক কবি হিসেবে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সিকান্দার আবু জাফর ‘সংগ্রাম চলবেই’ ছাড়া আর কোনো ভালো কবিতা তো লিখতেই পারেননি। হাসান হাফিজুর রহমান ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি ভালো কবিতা লিখেছে, তারও বাকি কবিতা আমার ভালো লাগে না। আবুবকর সিদ্দিক কবিতার চেয়ে কথাশিল্পে ভালো। আবদুল গনি হাজারীর কিছু কবিতা টিকবে, দিলয়ারও কিছু কবিতা লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক লেখক হিসেবে বড় কিন্তু মন ছোট। বেলাল চৌধুরী তো কবিতা লিখতেই পারলেন না আজও। ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু কবি হিসেবে ওকে আমি ঠাঁই দিতে পারিনি। ফরহাদ মাজহার কিছু ভালো কবিতা লিখলেও সে আল মাহমুদের পথে চলে গেছে। কবি ও লেখকদের প্রগতিশীল হতে হয়। এ কথা ঠিক, কবি ও লেখকরা কখনো কখনো বিভিন্ন মতবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

একটু থেমে আবার শুরু করলেন তিনি। আসলে হয় কি, শিল্প-সাহিত্যের জগতে একটা প্রবলেম হয়ে যায়। প্রবলেমটা হয়ে যায়, যে তোমার, যেটা ইউরোপ-আমেরিকায় দেখা গেছে- অনেক লেখকই ফ্যাসিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন নানা কারণে। ফ্যাসিজমের দর্শনটা অনেক সময় আকর্ষণ করে রাইটারদের। মেধাবী মানুষের শাসনে বিশ্বাস করে ফ্যাসিবাদ। কিন্তু নাৎসিবাদ আর ফ্যাসিবাদ কিন্তু এক জিনিস না। জার্মানিতে নাৎসিবাদের মূল কথা হলো, আর্যদের শাসন থাকবে অনার্যদের ওপর। ইহুদিরা আর্য বা অনার্য না, এই ইহুদিদের শেষ করতে চেয়েছিল ওরা। ভয়াবহ একটা জিনিস নাৎসিবাদী দর্শন। আর ফ্যাসিবাদ মনে করে অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের সিম্বল হলো এ রকম, ধরো অনেকগুলো বাঁশের কঞ্চিকে একটা কুড়াল দিয়ে কেটে ফেলা যায়। এই কুড়ালটা হচ্ছে মেধা, মেধাবী ব্যক্তি ক্ষমতা; জনগণের ক্ষমতার চেয়ে বেশি শক্তি ধারণ করে। অর্থাৎ মেধাই পৃথিবীকে শাসন করে। এজন্যই অনেকেই ফ্যাসিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

একদম প্রথম যখন ফ্যাসিবাদের সূচনা হয়। যখন ফ্যাসিবাদ জার্মানিতে নাৎসিবাদে ঘুরে গেল, তখন কোনো কোনো লেখক নাৎসিবাদে বিশ্বাসী হয়েছেন। যেমন, এজরা পাউন্ডকে তো বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হলো এবং পরে তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয় এবং তার ইন্টারভিউ করা হয়। তখন দেখা গেল, সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। তারপর তাকে ওয়াশিংটনে একটি মেন্টাল হসপিটালে লক ইউনিটে বন্দি করে রাখা হয় এবং প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর সেখানেই ছিল। পরে আমেরিকার বড় বড় কবিরা (যেমন রবার্ট ফ্রস্ট) আবেদনের মাধ্যমে তাকে বের করে পাঠিয়ে দেন ইতালির রোমে। পাঠাবার আগে তাকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি বিখ্যাত পুরস্কার ‘গোগেনহাইম পোয়েট্রি অ্যাওয়ার্ড’ দেয়া হয়।

অনেকে প্রতিবাদ করেছেন, কেন তাকে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে? সে অতীতে মুসোলিনির পক্ষে রেডিওতে ফ্যাসিবাদের প্রচার করেছে! কিন্তু পুরস্কার দেয়ার পক্ষের ব্যক্তিরা বললেন যে, তিনি হলেন একজন মেজর লেখক এবং তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ক্রিয়েটর অব মডার্ন পোয়েট্রি এবং তার কবিতাতে কোনো ফ্যাসিবাদ নেই। পাশাপাশি অতীত থেকে বর্তমানের অনেক লেখকের লেখায় কিন্তু ফ্যাসিজমের গন্ধ পাওয়া যায়। কলকাতাতে বুদ্ধদেবের শেষ জীবনে ‘ভগবান ও ভগবান’ করতে করতে মুখে ফেনা উঠে গেছে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সব সময়ই তোমার ভগবানে বিশ্বাসী লোক। শীর্ষেন্দু সন্ন্যাসী নকুলের শিষ্য। আর আমাদের লেখকদের মধ্যে অনেকে জামায়াতে ইসলামী না, কিন্তু ধর্মে বিশ্বাস করে।

সিকদার আমিনুল হককে দেখেছি আমি, সব সময়ই সে নাস্তিক ছিল। তারপর হার্টে বাইপাস সার্জারি হলো। আমেরিকাতে এলো। হীরা মানে বদরুদ্দিন উমর আর ও উঠল একই কামরায়। আমি গেছি ওখানে আড্ডা দিতে। বদরুদ্দিন উমর ওখানে বসা, সিকদার আমিনুল হক বলল, দাঁড়ান শহীদ ভাই, আমি নামাজটা পড়ে নিই। দেখি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে! দেখে আমি আর কিছু বললাম না, বুঝলাম যে মৃত্যুভয় এসেছে। তো এখন আমাদের সবাই যে নাস্তিক হবে, সবাই যে ধার্মিক হবে না, এমন তো কোনো কথা নেই। তবে ধার্মিক হলেই যে তাকে ‘রাজাকার’ বলতে হবে এটাও ঠিক না।

আল মাহমুদের ব্যাপারটা হচ্ছে কি- টাকা। অলওয়েজ মানি। আল মাহমুদকে যদি মফিদুল হকরা টেনে আনত, যদি ওর একটা চাকরির ব্যবস্থা করত, দৈনিক বাংলায় কিংবা বাংলা একাডেমিতে, ও যেত না জামাতে ইসলামীতে- আমি জানি সেটা। অলওয়েজ তার টাকা দরকার। ইত্তেফাকে প্রুফরিডারি করত, বাংলা একাডেমিতে প্রুফরিডারি করেছে। কেউ তাকে চাকরি দেয়নি। কারণ সে জাসদ করত, যখন তাকে গণকণ্ঠের দায়িত্ব নিতে বলা হলো, তখন সে নিলো। অথচ সারা জীবনই সে প্রুফরিডারি করেছে। আমি নিজে চাকরি পাইনি। ওর ভিতরের ব্যাপারটা আমি জানি তো। সারা জীবন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কলসিতে করে জিয়ল, কৈ আর মাগুর মাছ পাঠিয়েছে, সে মাগুর মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছে। তার কাছে পাঁচটার বেশি কিংস্টার সিগারেট থাকত না। এর বেশি সে কিনতে পারত না। তাঁকে যখন সৈয়দ আলী আহসান বাংলা একাডেমিতে চাকরি দিল, ওই আবার প্রুফরিডারের জব।

তারপর মারধোর খেলো, মারধোর খেয়ে জেলে গেল। জেল থেকে বের হলে গিয়াস কামাল চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে ধরে ওকে শিল্পকলা একাডেমীতে আনল এবং শিল্পকলা থেকে রিটায়ার্ড করল। রিটায়ার্ড করার পর কী করবে? তার তো মাসে মাসে টাকা দরকার? চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে। তখন তাঁকে টোপ দিলো জামায়াতে ইসলামী। যে আল মাহমুদকে নিয়ে গেল, তার নামটা মনে পড়ছে না, সিলেট বাড়ি, রফিক আজাদের ক্লাসমেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরে ছিল, কবি আবুল…আবুল…কী জানি নামটা? আজকাল মনেও থাকে না, আমি তাকে চিনি…এনিওয়ে… সে আল মাহমুদকে সিলেট নিয়ে গেল, সেখানে জামায়াতে ইসলামীতে তাকে রিক্রুট করে নিল। তারপর কী করল, আল মাহমুদের কাব্যসংগ্রহ বের করে দিল এবং ২৫ হাজার টাকা সম্মানী দিল। তারপর যুক্ত করে দিল তাদের পত্রিকার সঙ্গে। এই হলো আল মাহমুদের জামায়াতি হবার নেপথ্য কথা।

আমরা এখানে তোমার নির্বাচিত কবিতার ‘ফড়িঙের পাখা পোড়ে’ কাব্যগ্রন্থের পাঁচটি কবিতা পড়িয়েছি আমাদের ত্রৈমাসিক ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠানে। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোতে পঠিত সব কবিতাই এখন ইউটিউবে দিচ্ছি। তোমার কবিতাগুলোও শোনা যাবে ইউটিউবে।
আমি বললাম, এটি আমার জন্যে সত্যি আনন্দের খবর, কাদরী ভাই।
না না ঠিক আছে, তোমার কবিতা তো ভালো, আর ভালো কবিতা বৃহত্তর পাঠকের কাছে যাওয়া উচিত।

তুমি তো ঢাকায় ফিরে যাচ্ছ, যাও। টেলিফোনে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ হবে। তোমার ফোনে কি ভাইবার আছে?
বললাম, আছে।
তাহলে ভাইবারে কথা বলব। শোনো, ইউপিএল থেকে আমার সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করেছিল। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে কাইয়ুম চৌধুরী, আবুল হাসনাতও যোগাযোগ করেছিল। হাসনাত বলেছিল, নতুন কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি দিতে। বলেছি, নতুন কবিতার পাণ্ডুলিপি দেয়া সম্ভব নয়। পরে বলল, শ্রেষ্ঠ কবিতা করতে চায়। বললাম, আমার সব কবিতাই শ্রেষ্ঠ। কাজেই শ্রেষ্ঠ কবিতাও করতে চাই না।

শোনো শিহাব, আমার শরীর যদি সায় দেয়, আমি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা নিয়ে একটি সংকলন করতে চাই। আসলে এই কাজটি শামসুর রাহমানের করার কথা ছিল। এখন সিনিয়র হিসেবে আমাকেই করতে হবে।
বললাম, সৈয়দ শামসুল হক আছেন, আল মাহমুদ আছেন?
হক করবেন না, আর মাহমুদকে দিয়ে সম্ভব না। তা ছাড়া ও এখন জামায়াতপন্থি মানুষ। কাজেই আমিই এটি করব, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে।
বললাম, কোন দশক পর্যন্ত কবিদের রাখবেন?
শূন্য দশক পর্যন্ত।
দ্বিতীয় দশকেরও তো কয়েকজন ভালো লিখছে।
ওদের আমি চিনি না, এদের কবিতা তাহলে তোমাকেই জোগাড় করে দিতে হবে। আমরা চল্লিশের আবুল হোসেন, আহসান হাবীব থেকে দ্বিতীয় দশকের কয়েকজনের কবিতা নিয়ে এই সংকলনটি তাহলে করব। একটা বিষয় মনে রেখো, অগ্রজদের বেশি কবিতা থাকবে আর নতুনদের তুলনায় কম। তবে ভালো কবিতা বাছতে একটু সময় লাগবে। যেমন ধরো তোমার কবিতা। তোমার একটি মাত্র কবিতার বই আমার হাতে ছিল। সেখান থেকে আমি পাঁচটি ভালো কবিতা পেয়েছি অথচ তোমার কবিতার বই বেরিয়েছে সাতটি। সুতরাং যাদের কবিতা আমরা নেব, তাদের একাধিক কবিতা আমাদের জোগাড় করতে হবে। আমার কাছে অবশ্য প্রবীণ ও বয়স্কদের অনেকের কবিতাই আছে, নতুনদের বেশি বেশি কবিতা আমার কাছে পাঠাও।

বললাম, ঠিক আছে। তবে প্রথমেই নতুনদের একটি তালিকা আপনাকে পাঠাচ্ছি।
হ্যাঁ, তুমি তালিকা পাঠাও, সেই তালিকা থেকে আমি নির্ধারণ করে দেব, কাকে কাকে নেয়া যায়। হুমায়ুন আজাদ, রফিকউল্লাহ খান, সাজ্জাদ শরিফসহ যারা বাংলাদেশের কবিতার সম্পাদনা করেছেন, তাদের সবগুলোই প্রায় আমি দেখেছি।
বললাম, আশি, নব্বই ও শূন্য দশকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলাদা আলাদা সংকলন হয়েছে কাদরী ভাই।
আমি ওগুলো এখনো দেখিনি, তুমি ঢাকায় গিয়ে আমার কাছে পাঠাও- আমি দেখব এবং সব কবিতা পড়ব।

কবিতা নেয়ার ক্ষেত্রে তোমাকে বলি, যেমন বুদ্ধদেব বসু তাঁর সংকলনে পঞ্চাশের দু-একজনকে নিয়েছিল। আমিও সে রকমভাবে দ্বিতীয় দশকের দু-একজনকে নেব। তবে কতজন নেব তা এই মুহূর্তেই বলা যাচ্ছে না। আমার কাছে ধরো, পঞ্চাশ ও ষাট দশকের প্রায় সবার কবিতাই আছে। চল্লিশের আহসান হাবীব আছে, আবুল হাসানের কবিতাসমগ্র আমার কাছে নেই। ওর সমগ্রসহ বাকি নতুনদের সব কবিতা তুমি জোগাড় করে দেবে আমাকে।
বললাম,wR¡।
অনেক ভালো কবিতাও অনেক সময় নেয়া যায় না। কারণ আমাদের সমাজ এখনো অনেকটা রক্ষণশীল। যদিও বাংলা কবিতা এগিয়েছে অনেক দূর। তবু ওসব মাথায় রেখে কবিতা বাছাই করতে হবে। সিনিয়রদের একটু বেশি কবিতা নেব আর জুনিয়রদের কম। কাজটি সময় নিয়ে এবং সুন্দর করে করতে হবে। আর এটি প্রকাশ করার জন্য ঢাকার যে প্রকাশনা সংস্থা রাজি হবে, আশা করি, তাদের সঙ্গে কথা বলে সংকলনের কলেবর ঠিক করা যাবে।

এটুকু বলেই কথা আপাতত শেষ করলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। তখন সন্ধ্যা শেষে রাত নেমেছে নিউ ইয়র্কে এবং বাইরে বজ্রবৃষ্টি হচ্ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে থেমে গেছে। তিনি একটি কলম চেয়ে নিয়ে বললেন, নীরা, আমার নির্বাচিত সাক্ষাৎকার গ্রন্থটি শিহাবকে এক কপি দিতে চাই। নীরা কাদরী বইটি এনে দিলেন তাঁর হাতে। বইটির নাম ‘আলাপে আড্ডায় শহীদ কাদরী : নির্বাচিত সাক্ষাৎকার’। নিজ হাতে লিখে দিলেন- ‘শিহাব শাহরিয়ার, অনুজ প্রতিমেষু, শহীদ কাদরী, নিউ ইয়র্ক’।
আমিও আমার সপ্তম কবিতার বই ‘খড়ের খোঁয়াড়’ তাঁর হাতে দিলাম। তিনি খুশি হয়ে বললেন, আমি পড়ব।
বললাম, এবার আসি?
বললেন, এসো, আবার দেখা হবে, ভালো থেকো।
আপনিও ভালো থাকবেন।

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someone

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*