উদ্বোধনের আগেই ধসে গেলো তিস্তা সড়ক সেতুর সংযোগ সড়ক | sampadona bangla news
শনিবার , ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

উদ্বোধনের আগেই ধসে গেলো তিস্তা সড়ক সেতুর সংযোগ সড়ক

সম্পাদনা অনলাইন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক উদ্বোধনী তারিখ ঘোষনার দুই দিন আগেই অবশেষে তিস্তার পানির তোড়ে ধসে গেলো রংপুর-লালমনিরহাটের মহিপুর-রুদ্রেশ্বর সিমান্তে তিস্তা নদীর ওপরের দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তরপ্রান্তের সংযোগ সড়ক। ফলে বহুল প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধির দ্বার হিসেবে বিবেচিত দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুটি এখন কার্যত লালমনিরহাটের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলো।
এদিকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ওই সড়কে স্বাভাবিক যোগাযোগ নিশ্চিত করার জন্য এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি। স্থাণীয়রা বলছেন, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের নজিরবিহীন গাফিলতির কারনে ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের ভয়াবহ নড়েবড়ে অবস্থার মধ্যেই আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর চালু হতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই দিন বেলা সাড়ে ১১ টায় সেতুটির উদ্বোধন করবেন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। সেতুটির সংযোগ সড়ক নিয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

এর আগে জুলাই মাসের বন্যায় ব্রিজের মোকা ধসে পড়লে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করেছিল সংশ্লিষ্ট দফতর। ফলে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সেতুটি উদ্বোধন করলেও সহসাই কোন যানবাহন ও পথচারী সরাসরি ওই ব্রীজ দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। নৌকা দিয়ে পার হয়ে এসে উঠতে হবে সেতুতে। সেতুটি অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়লো। এদিকে ধসে যাওয়ার এই ঘটনায় ওই এলাকার মানুষের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ বিরাজ করছে।

লালমনিরহাট ডেপুটি কমিশনার শফিউল আরিফ সাংবাদিকদের জানান. দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। যথাসময়েই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যথা সময়ে হবে। ধসে যাওয়া অংশ দ্রুত মেরামত বা সাময়িক যোগাযোগের জন্য ব্যবস্থা করতে প্রকৌশল বিভাগ কাজ করছে।
সংযোগ সড়ক নির্মানে নি¤œমানের কাজ ও ধসে যাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হন নি কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান। তবে তিনি বলেন, নদী প্রতিমুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন করে থাকে। সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার সময়ের গতিপথ অনুযায়ী সেতু ও নদী শাসন বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এখন নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সেটা দেখার কাজ আমার নয়, এটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ। তারা দেখবে।
স্থানীয় অধিবাসি ফারুক হোসেন জানান, সংযোগ সড়ক নির্মাণের শুরু থেকে কাজের মান নিয়ে অভিযোগ করেও সুফল মেলেনি। নিম্নমানের কাজ ঢাকতে চার দফায় সংস্কার করেও চলাচলের উপযোগী করতে পারছে না প্রকৌশল দফতর। নদী শাসনের ১৩০০ মিটার বাঁধ অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। এখন লোকালয় ভাঙ্গার পাশাপাশি ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙ্গে যাচ্ছে। পলে উদ্বোধনের আগেই দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুটি অকার্জকর হয়ে পড়লো।
এদিকে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনার এই সেতুটির সংযোগ সড়ক বেহাল দশায় উদ্বিগ্ন সবাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেতুটি চালু হলে ভারি যানবাহনের লোড নেয়ার মতো সক্ষমতা নেই সংযোগ সড়কটির। এছাড়াও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারনে যেকোন মুহুর্তে সড়কটি পুরোটাই ধসে গেলে কোন কাজে আসবে না বহুল কাঙ্খিত তিস্তা সড়ক সেতুটি।
সিডিউল অনুযায়ী একনেকে পাশ হওয়া বরাদ্দের মধ্যেই সেতুর উত্তর প্রান্ত থেকে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের কাকিনা পর্যন্ত ৫ দশমিক ২৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ২টি প্যাকেজে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ও এই সড়কে ২টি ব্রিজ ও ৩টি কালভার্ট নির্মাণে ৩টি প্যাকেজে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে রংপুরের অংশে ৫৬৩ মিটার সড়ক নির্মাণে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। এত বিপুল পরিমান টাকা এই কাজে ব্যয় করা হলেও চলতি জুন-জুলাই মাসের বন্যায় সেতুটির উত্তর প্রান্ত থেকে কাকিনা পর্যন্ত সংযোগ সংযোগ সড়কের অধিকাংশ স্থান ধসে যায়। চলাচলের অযোগ্য হয়ে পরে এই সড়ক। শুধু তাই নয়, সড়কটি নির্মানের পর আবারও সড়ক বর্ধিত করার নামে ২টি প্যাকেজে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয। সড়কটি প্রস্থে ১২ থেকে ১৮ ফুট হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে এখনও চলাচল অনুপোযোগি। এরপর তৃতীয় দফায় আবারও ৫ কিলোমিটার সড়কটি শক্তিশালী করার নামে বরাদ্দ নিয়ে ৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। সাধারণত সড়ক শক্তিশালী করণে প্রতি কিলোমিটারে ১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। কিন্তু এ সড়কে তিনগুণ অর্থ বেশি খরচ করেও কোন কাজ হচ্ছে না। ৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে তিন দফায় মোট ১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও এখন সংযোগ সড়কটি ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগি হয় নি।

এ ব্যপারে লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম জাকিউর রহমান জানান, তিস্তা গতিপথ পরিবর্তান করায় পানি ¯্রােতে সংযোগ সড়কের ইচলি এলাকার ব্রীজটি মোকা ধসে গেছে। এখন সড়কটিতে আপাতত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছে। আমরা চেষ্টা করছি জিও ব্যাগ দিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করার জন্য। তিনি জানান সম্প্রতি বন্যায় তিস্তা দ্বিতীয় সড়ক সেতুর সংযোগ সড়কের ব্রীজের কিছু অংশ ধসে গেছে। বালুর বস্তা ফেলে সংযোগ সড়ক ভাঙন ও ধস ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়ছিল।
যেভাবে শুরু হলো দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর কাজ: স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রংপুর জোনাল অফিস সূত্র জানায়, দীর্ঘ দাবির প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে (একনেক) বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুরে গ্রামীন যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষিটারী ইউনিয়নের মহিপুর এবং লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর সিমান্তে তিস্তা নদীর ওপর ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ এবং ফুটপাতসহ ৯ দশমিক ৬ মিটার প্রস্থের দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণের জন্য ১২১ কোটি ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করে সরকার। এরপর টেন্ডার আহবান করা হলে সেতুটি নির্মানের কার্যাদেশ দেয়া হয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ডাব্লিউ এমসিজি নাভানা কনস্ট্রাকশনকে। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেতুটির নির্মান কাজের উদ্বোধন করেন সেই সময়কার এবং এখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এলজিইডি সূত্র জানায়, প্রথমে সেতু নির্মাণে ২২ মাস সময় ধরা হলেও ২০১৪ সালের ৩১ জুন মেয়াদ শেষে সেতুর মাত্র ৪৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ায় এলজিইডি। প্রথম দফা সময় বৃদ্বির মেয়াদে সেতুর মাত্র ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়। ফলে আবারা ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় বারের মতো সময় বাড়ানো হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সেতুটির নির্মান কাজ শেষ করে কালিগঞ্জ এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নাভানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*