ইঁদুর | sampadona bangla news
বুধবার , ২১ নভেম্বর ২০১৮

ইঁদুর

সাদী : ইদুরইঁদুরের যন্ত্রণায় ১২ শতকে জার্মানির হ্যামিলনে বাঁশিওয়ালাকে ইঁদুর তাড়ানর ফি বাবদ টাকা না দেয়ায় শহরের সব শিশুদের হারাতে হয়েছিল। আধুনিক যুগেও ইঁদুর নিয়ে যে যন্ত্রনা তা খুব কম না। কিছুটা বোঝা যাচ্ছে ইদু মিয়াদের মতো লোকের অবস্থা দেখে।

ইদু মিয়ারা মোটামুটি বড় গৃহস্থ। বছরে প্রায় দুই হাজার মণ শুধু ধানই পায়। ধান রাখতে হয় উঠানের গোলা ঘরে। এক একটা গোলা ঘরে একশো মণ ধান রাখা যায়। একবার ওই গোলা ঘর থেকে দশ মণ ধান ইঁদুর চুরি করেছিল। গোলা ঘরের তলা ছিদ্রি করে ওই চুরির কাজ সম্পূন্ন করেছিল ইঁদুর। একশ মনের ওই গোলা ঘরে যদি পঞ্চাশ মণ ধানও থাকত তবে হয়তো তাও নিয়ে যেত ইঁদুর। ভাগ্যিস তা ছিল না। এই ভাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ইঁদুর ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্যশস্য নষ্ট করে।

গোলা ঘরের নীচে একটা গর্ত ছিল। ওই গর্তের চার পাশে খুড়ে একটা ক্যানেল পাওয়া যায়। এর পর ওই ক্যানের খুড়তে খুড়তে প্রায় দুশো গজ যাওয়ার পর ধানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রায় এক কিলো মাইল ক্যানেলের মধ্যে ছিল দশ মণ ধান। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ছিল।

চাকরির সুবাদে ইদু মিয়া এখন রাজধানীতে থাকে। এখানেও ইঁদুরের অত্যাচার। ভাল সুস্বাদের তরকারি বা পছন্দের মাছ রাধা হয়েছে। খাওয়ার পর অবশিষ্ট মাছ বা তরকারি ভুলে ফ্রিজে না রখলে দেখা যাবে ইঁদুর ওই মাছের বাটির মধ্যে জাকিয়ে বসে আছে। আর কুট কুট করে তরকারি খাচ্ছে। বাসার লাখ টাকা দামের সেগুন কাঠের শখের আলমারি, শো কেসের তলা ইঁদুর খেয়ে ফেলেছে। অথচ ইদু মিয়া জানে ইঁদুর খাওয়ার জন্য সবকিছু কাটে না। বরং এদের  ছেদন দাঁত ঠিক রাখার জন্য যেখানে যে অবস্থায় যা থাকে তা-ই কাটাকাটি করে। কারণ ইঁদুরের ছেদন দাঁত জন্মের পর হতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বাড়ে এবং পড়ে না। ছেদন দাঁত বড় হয়ে গেলে ইঁদুর আর খেতে পারে না। তাই শুধু ছেদন দাঁতের বৃদ্ধি রোধের জন্য কাটাকাটি করে থাকে।

অতিষ্ঠ হয়ে ইদু মিয়া নীলক্ষেত থেকে হাজার টাকা দিয়ে বিড়ালের বাচ্চা কিনে আনল। বিড়ালের বাচ্চাকে ফিডার দিয়ে দুধ খাইয়ে বড় করল। বাচ্চাটা বড় হয়ে মাছ ছাড়া কিছুই খেত না। আর শুধু আরাম খুঁজত। কাজের কাজ ইঁদুরের ব্যাপারে কোন আগ্রহই ছিল না ওই বিড়ালের। তাই ইদু মিয়া সিদ্ধান্তে আসলো বর্তমান যুগের বিড়ালরা আর ইঁদুর শিকার করে না। তারা শুধু খায় আর হাগে। বিছানার মধ্যে খাটের নীচে হেগে মুতে এমন অবস্থা করল যে, শেষে গাড়িতে করে বহু দুরে নিয়ে যেয়ে ওই বিড়াল ছেড়ে আসতে হয়েছিল। অল্প দুরে নিয়ে বিড়ালটিকে ছেড়ে আসলে সে বার বার ফিরে আসেতো। ইদু মিয়া পত্রিকায় পড়েছিল, আমেরিকার এক বিড়াল নাকি তার প্রভুর খোঁজে পাঁচ ছায় হাজার মাইল দুরে অন্য এক রাজ্যে গিয়ে হাজির হয়েছিল।

ইঁদুরের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য বিষ প্রয়োগ করা হলো। তাতে ইঁদুর কতোগুলো মরল তা বোঝা গেলা না। কিন্তু পচা গন্ধে এমন অবস্থা হলো যে সংসারের শান্তিই বিনষ্ট হলো। বিছনা পাটরা, হাড়ি-পাতিল ওলট পালট করে দু’একটা লাশ উদ্ধার করা গেলেও। প্রায় পনের দিন ইঁদুর পচা গন্ধে অসুস্থ হওয়ার যোগার হলো। মনে হয় মাস খানেক পরই আবার আরম্ভ হলো নতুন প্রজন্মের অত্যাচার। কারণ ইঁদুরের অল্পবয়স থেকেই প্রজননক্ষমতা অনেক। দিনে অন্ততঃ বিশবার সহবাস করে।  দু’মাসের মধ্যেই বাচ্চা বিয়াতে পারে। বিশ একুশদিন গর্ভধারণের পর একসাথে ৮টি বাচ্চা বিয়ায় এবং ৩-৪ সপ্তাহ পর আবারও বাচ্চা হয়।

ইদু মিয়া আবিস্কার করল ইঁদুর অনেক বুদ্ধিমান প্রাণী! কারণ একটা কল এনেও ইঁদুরের বংশ ধংস করা গেল না। ইঁদুর মারার কলে মাত্র দু’ একটা ইঁদুর পড়ে মরল। আর কোন ইঁদুর ওই কলের ধারে কাছেও ঘেসলো না। আঠা আনা হলো তাতেও ওই একই রেজাল্ট। দু-একটা ইঁদুর আঠায় আটকালো আর কেউ ও আঠার মধ্যে পড়লা না। আঠার পাশ দিয়ে হাটাহাটি করতে দেখা যায়; কিন্তু আঠায় আর পা দেয় না কোন ইঁদুর।

ইদু মিয়া বইতে পড়েছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্ত প্রাণির সৃষ্টি হয়েছে। যেমন ক্ষেত খামারে ইঁদুর গর্ত করলে, সেই গর্তে ঢুকে ইঁদুর খেয়ে সাপ তার নিজের বাসা বানায়। গ্রামে না হয় ওই ভাবে ইঁদুরের হাত থেকে কিছুটা বাঁচা যেতে পারে কিন্তু শহরে কিভাবে তা সম্ভব। কারণ শহরে নেই বন বিড়াল, গুঁইসাপ, সাপ, শিয়াল, পেঁচা ও বাজ পাখি যা থেকে ইদুরের উৎপাত কম হতে পারে।

ইদু মিয়া জানতে পেরেছে, বাংলাদেশে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, দিনাজপুর রাজশাহীসহ অনেক জেলায় বহু মানুষ ইঁদুরের মাংস খায়।অবশ্য দেশে কত মানুষ ইঁদুরের মাংস খায় তা সে জানে না।

অন্যদিকে ভিয়েতনামে কিছু কিছু বিয়ের অনুষ্ঠানে এক প্লেট ইঁদুরের মাংস  ছাড়া  বিয়ের আনন্দ, উৎসব আর অভ্যর্থনা কোনটাই জমে না। নবদম্পতির জন্য  ইঁদুরের  রোস্ট  খুবই গুরুত্বপূর্ণ  বলে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণ-ভিয়েতনামের কয়েকটি প্রদেশে ইঁদুরের মাংস বাজারজাতকরণ ও হোটেলগুলোতে প্রাপ্যতা বিষয়ে জরিপ হয়েছিল। জরিপের ফলাফলে দেখা যায় যে, দক্ষিণ ভিয়েতনামের ৬টি প্রদেশে ৫টি পথে ইঁদুরের মাংস বাজারজাত হয়ে থাকে। মেকংগের  সব হোটেলে ইঁদুরের মাংস প্রধান জনপ্রিয় মেনু।  জানা যায়,  প্রতি বছর ইঁদুরের মাংসের জন্য ৩৩০০-৩৬০০ টন জীবন্ত ইঁদুর বাজারজাত করা হয়। আর তাতে বছরে ২৫ লাখের বেশি  ইঁদুর  মাংসে পরিণত হয়।

অন্যদিকে প্যারিসে এই মূহুর্তে মানুষের সংখ্যার দ্বিগুণ ইঁদুরের বাস। ফলে যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। তিন চার মাস আগে থেকে ইঁদুরের অত্যাচারে নগরের প্রসিদ্ধ কয়েকটি পার্ক আর বাগানও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন বাধ্য হয়ে ইঁদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে নগর কর্তৃপক্ষ। জার্নাল দ্যু দিমানশে নামে এক সাপ্তাহিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে মেয়র এ্যান হিডালগো বলেছেন, ইঁদুর মারার ফাঁদ কেনার জন্য তের কোটি টাকা খরচ করা হবে।

ভিয়েতনামে ইঁদুর খাওয়ার ওই চাহিদার কথা জানতে পেরে ইদু মিয়ার মাথায় এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের আইডিয়া এসেছে। ফ্রান্সে ইঁদুর পরিস্কার করার জন্য যে তের কোটি টাকা বাজেট ঘষণা করা হয়েছে সেখান থেকে সে লাভবান হতে চায়। ইদু মিয়া ফ্রান্স সরকারকে একটা অফার দেবে, সে ওই দেশের সব ইঁদুর পরিস্কার করবে । বিনিময়ে ফ্রান্স যাওয়ার ভিসা চাইবে। তার পার ফ্রান্স সরকারের টাকা দিয়ে ইঁদুর ধরবে আর ভিয়েতনামে এক্সপোর্ট করবে। এর পর ওই দেশেই স্থায়িভাবে থাকার জন্য আবেদন করবে। যদি থাকতে পারমিশন না দেয় তবে পালিয়ে যাবে।

হঠৎ ইদু মিয়ার মনে পড়ল ইঁদুর নিয়ে এক হিন্দু পুরাণের কথা। তাতে সে পড়েছিল, এক ইঁদুরের বাচ্চাকে মারার জন্য তারা করছিল শিকারির দল। ইঁদুরের বাচ্চাটি লুকাল বনে এক ঋষির পায়ের খরমের নীচে। ইঁদুরের বাচ্চাটিকে দেখে ঋষির খুব মায়া হলো। সে ইঁদুরের বাচ্চাটিকে মন্ত্রদিয়ে মানুষ বানিয়ে দিল। ইঁদুরের বাচ্চাটি ছিল লিংগে মেয়ে, তাই বাচ্চাটিও হলো মেয়ে। ঋষি মেয়েটিকে সাথে সাথে রেখে আদর যত্ন করে বড় করল। মেয়েটি বিবাহের উপযুক্ত হলো।

ঋষি তখন বলল, ‘মা এখন তুমি বড় হয়েছ, তোমার বিয়ে দিতে হবে। তুমি পাত্র পছন্দ করো। আমি তোমার পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে দেব।’

মেয়েটি বলল, ‘এই সৃষ্টির সবচেয়ে যে শক্তিশালী, তাকে আমি বিয়ে করব।’

ঋষি তখন বলল, ‘তাহলে তুমি সূর্যকে বিয়ে করো।’

মেয়েটি বলল, ‘সূর্য তো ডুবে যায়, সে শক্তিশালী নয়।’

ঋষি বলল, ‘তা হলে বাতাসকে বিয়ে করো।’

মেয়েটি বলল, ‘না বাতাস পাহারে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়, সেও শক্তিশালী নয়।’

ঋষি তখন বলল, তাহলে পাহারকে বিয়ে করো’

মেয়েটি বলল, না পাহারকে ইঁদুর ছিদ্রি করে ফেলে, সেও শক্তিশালী নয়।

ঋষি তখন বলল তাহলে ইঁদুরকে বিয়ে করো।

মেয়েটি বলল, হাঁ ইঁদুরই সবচেয়ে শক্তিশালী, আমি ইঁদুরকেই বিয়ে করব।’

ঋষি তখন মনে মনে ভাবল, আর হাসলো। হায়রে ইঁদুর! আমি তোকে আমার সাধনা আর মন্ত্রবলে মানব জন্ম দিয়ে উন্নত করতে চাইলে কি হবে, ‘তুই ইঁদুর ইঁদুরই থকবি।’ ঋষি তখন মন্ত্র দিয়ে বলল, ‘যা তুই তোর অতীত জন্মে ফিরে যা-ইঁদুর হয়ে যা।’ তখন মেয়েটি ইঁদুর হয়ে গেল এবং আরেক ইঁদুরকে বিয়ে করে চলে গেল। এই পুরাণ থেকে বুঝতে হবে ইঁদুর কত বড়, শক্তিশালী-বুদ্ধিমান প্রাণী।

তাই ইদু মিয়া কি পারবে ইঁদুরের সাথে বুদ্ধির জোরে জিততে, আর লাভবান হতে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*