আবদুল আলীম | sampadona bangla news
বুধবার , ২৬ জুলাই ২০১৭

আবদুল আলীম

আব্দুল আলীমসম্পাদনা অনলাইন মরমি কণ্ঠশিল্পী আবদুল আলীমের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। শিল্পীর স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকালে ঢাকার বনানীতে শিল্পীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে আবদুল আলীম ফাউন্ডেশন।

সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ের ‘গানে গানে সকাল শুরু’ অনুষ্ঠানে আবদুল আলীমের গান। গাইবেন শিল্পীর তিন সন্তান জহির আলীম, আজগর আলীম ও নূরজাহান আলীম। একই দিনে বাংলাদেশ টেলিভিশনে থাকবে গান ও আলোচনা। সেই অনুষ্ঠানে ওই তিন ভাইবোন ছাড়াও অংশ নেবেন তাঁদের আরও দুই সহোদর আখতার জাহান আলীম ও আসিয়া আলীম।

বাংলা লোক সংগীতের কালজয়ী এ শিল্পী ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে ২৭ জুলাই ১৯৩১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা ইউসুফ শেখ ও মা খাসা বিবি। কৃষি নির্ভর পরিবার। তালিবপুর গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে আব্দুল আলীমের পড়াশুনা শুরু। ভাষা শহীদ বরকত ছিলেন আব্দুল আলীমের স্কুল জীবনের সাথী। অর্থনৈতিক কারণে পরিবারের পক্ষে আলীমের পড়াশুনার জন্যে বাড়তি কিছু ব্যয় করা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

গ্রামোফোন রেকর্ড শুনে গান গাইবার জন্যে আগ্রহ জন্মে। গ্রামের লোকদের বালক আব্দুল আলীম গান শুনিয়ে মুগ্ধ করতেন। বিভিন্ন গ্রামীন পালা পার্বনে আব্দুল আলীম গান গেয়ে আসর মাতিয়ে রাখতেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেননি। পরিবারের পক্ষেও আব্দুল আলীমের জন্যে সংগীত শিক্ষারও কোন ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। প্রথমে তিনি নিজ জেলায় মুর্শিদাবাদে ওস্তাদ গোলাম আলীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ওস্তাদ উপলদ্ধি করলেন যে প্রকৃত শিক্ষা পেলে আলীম গানের ভুবনকে জয় করতে পারবেন। নিয়ে যান কোলকাতায়। সেখানে গ্রামোফোন কোম্পানীতে তখন কাজী নজরুল ইসলাম, অমর লোকসংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের সান্নিধ্যে এসে গান গাওয়া শুরু করেন।

১৩ বছর বয়সে প্রথম গান রেকর্ড হয়। কিশোর কণ্ঠে গাওয়া “আফতাব আলী বসলো পথে” “তোর মোস্তফাকে দে না মাগো” এই দু’টি গান তখন খুব সাড়া জাগিয়ে ছিল। সবাই তার প্রতিভা সম্পর্কে অগ্রীম ধারনা নিতে সক্ষম হলেন। ৪৭এর দেশ বিভাগের সময় আব্দুল আলীম কোলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় ফিরে এসে সংগীতের উপর দীক্ষা নিয়েছেন শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, মমতাজ আলী খান, কানাই লাল শীল, আবদুল হালিম চৌধুরী প্রমুখ গুণী শিল্পী/ওস্তাদদের কাছে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থান করে নেন ঢাকা বেতারে। বেতারের প্রথম গান ‘ও মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও’ যারা শুনেছেন সকলেই অশ্রুসজল চিত্তে আব্দুল আলীমকে স্মরণ করেন। বেতারের ষ্টাফ আটিস্ট হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন গান করতেন আবদুল আলীম।
তাঁর যাদুকরী কণ্ঠে গাওয়া অন্যতম গানগুলো হচ্ছে -নদীর কুল নাই, কিনার নাইরে/ নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা/ রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল/ এই যে দূনিয়া কিসের লাগিয়া/ দূয়ারে আইসাছে পালকি/পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই/হলুদিয়া পাখি, সোনারি বরণ/চিরদিন পূষলাম এক অচিন পাখি/কল কল ছল ছল নদী করে টলমল/সর্বনাশা পদ্মানদী/কেহই কার বেচাকেনা, কেহ আবার কান্দে/মনে বড় আশা ছিল যাব মদীনায় গানগুলো আজও বাংলার লোক সংগীতের শীর্ষে অবস্থান করছে। বাঙালীর হৃদয়ে আব্দুল আলীম স্থান করে রেখেছেন স্থায়ী ভাবে। তাঁর কণ্ঠে আধ্যাত্মিকতা, মুর্শিদী, মারফতী, ভাটিয়ালী, লালনগীতি সব ধরনের গানই শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। দেশও দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়লো তার সুনাম ও সুখ্যাতি।
তিনি রেডিওর পাশাপাশি টেলিভিশন চালু হলেও সেখানে লোক সংগীত পরিবেশন করেছেন প্রতিনিয়ত। তিনি প্রথম বাংলা চলচিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবিতে গান করেছেন। হাসান ইমাম পরিচালিত ‘লালন ফকির’ চলচিত্রে তিনি প্লে ব্যাক শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন। শুধু আব্দুল আলীমের গাওয়া গানেই ছবিটিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। তিনি প্রায় ৫০ এর অধীক ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। দর্শককের কাছে যে ছবি গুলো জনপ্রিয়তার উচ্চ শিখরে ছিল সেগুলো হচ্ছে- ‘এদেশ তোমার আমার’ ‘জোয়ার এলো’ ‘সুতরাং’ ‘নদী ও নারী’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘স্বর্ণকমল’, ‘গাঁয়ের বধু’, ‘দস্যুরানী’, ‘তীর ভাঙ্গা ঢেউ’ ‘সুজন সখী’। সে সময়ে ছবিতে গাওয়া গানগুলো  আজও প্রবীন দর্শক শ্রোতাদের মুখে মুখে। তিনি ৫০০ পাঁচশতের অধীক গান রেকর্ড করেন।
জননন্দিত এ শিল্পী লাহোরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্স এ সংগীত পরিবেশন করে ৫টি স্বর্ণ পদক লাভ করেন। এছাড়া জীবদ্দশায় তিনি বাংলাদেশ চলচিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরষ্কার ও পূর্বানী চলচিত্র পুরস্কার  লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ এ ভূষিত করেন।

৩০ বৎসর সংগীত সাধনা করে আব্দুল আলীম  আমাদের  যা দিয়ে গেছেন তার দেয়া সম্পদে আমাদের লোকসংগীতের  ভা-ার সমৃদ্ধ। আমরা এ শিল্পীর গাওয়া গানগুলো শুদ্ধভাবে পরিচর্যা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন । সুখের বিষয় এই যে, ঢাকা, রাজশীহী, চট্টগ্রাম, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ ও ঢাকা সরকারী সংগীত কলেজের সিলেবাসে ‘আব্দুল আলীমের জীবন ও সংগীত’ অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। যা থেকে আগামী প্রজন্ম গুণী শিল্পীকে জানতে ও শিখতে পারবে।
নজরুল তাঁর বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতায় লিখেছেনঃ

আব্দুল আলীমের জীবনে বিজয় লক্ষ্মী নারী হিসেবে এসেছেন ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার সুতার পাড়া গ্রামের মেয়ে জমিলা আলীম। জীবন সঙ্গিনী হিসেবে আব্দুল আলীমকে এগিয়ে যেতে প্রতিনিয়ত যুগিয়েছেন সাহস, অনুপ্রেরণা। সংসারের দায়িত্ব নিজে প্রতিপালন করে স্বামীকে নিবিষ্ট চিত্তে সংগীত সাধনা  করতে সহযোগিতা করেছেন। তাদের ৩ পুত্র ও ৪ কন্যা। প্রত্যেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত এবং সংগীতের সাথে জড়িয়ে আছেন। বিশেষ করে  পুত্র জহির আলীম, আজগর আলীম, হায়দার আলীম ও কন্যা নুরজাহান আলীম আব্দুল আলীমের গানগুলো বেতার ও টিভিতে প্রতিনিয়ত পরিবেশন করে পেশাদার শিল্পী হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে সংহত করতে সক্ষম হয়েছেন। অপর দুই কন্যা আকতার আলীম ও আছিয়া আলীম সাংসারিক কর্ম সম্পাদন করেও মাঝে মাঝে সংগীত পরিবেশন করেন। কনিষ্টা কন্যা জোহরা আলীম বাবার গানের প্রতি অনুরক্ত হলেও প্রবাসে অবস্থান করেন বিধায় চর্চা করা সম্ভব হয়না বলে দারুণ যন্ত্রণা অনুভব করেন।

ঢাকা সংগীত কলেজের লোকগীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর  মাত্র ৪৩ বৎসর বয়সে দূরারোগ ক্যান্সারে আক্রান্তে হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুতে সমগ্র জাতি তখন শোকগ্রস্থ  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোক বাণীতে বলেন ‘জাতি হারাল একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে, দেশ হারাল একজন বরেণ্য শিল্পীকে।’ জীবনদরদী মাটি ও মানুষের হ্রদয়ের কাছাকাছি থেকে যে শিল্পী সংগীত সাধনা করে গেছেন সে শিল্পী হারিয়ে যেতে পারেন না। হারিয়ে যেতে দেয়া যাবেনা। তিনি অনাদিকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টি কর্মে জন্যে, আজ শিল্পীর ৪২তম বার্ষিকীতে এ আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা।

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someone

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*