অলৌকিক (Miracle) বলে কিছু কি আছে?

 

মীর আখতার হোসেন নজরুল: ইংরেজিতে unworldly, unearthly, uncommon, extra-mundane, transcendental, miraculous, superhuman, supernatural কিংবা বাংলায় অলৌকিক, অতীন্দ্রিয়তা, দিব্যচক্ষু, দিব্যনেত্র, দিব্যদৃষ্টি, ইন্দ্রিয়াতীত, অপ্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, ইন্দিয়াগোচর, দেহাতীত অতিপ্রাকৃত, ইন্দ্রিয়হীন, নিরিন্দ্রিয় ইত্যাদি সমার্থ শব্দ দিয়ে বললে যারা (অতি) বাস্তববাদী বলে নিজেদের পরিচয় দিতে গৌরব অনুভব করেন, তারা নাক না সিটকালেও অন্ততঃ ভ্রুতে কুঞ্চন দেখাবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে যে অলৌকিক অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করলেও তার স্বরূপ উপলদ্ধি করি না বা দেখলেও সেভাবে ভাবতে অভ্যস্ত নাই। অর্থাৎ ব্যাপারটা যে অলৌকিক বা যুক্তি-বুদ্ধির উর্ধ্বে তা আমাদের বস্তুবাদী মনে কিছুতেই মেনে নেয় না।

কয়েকটা দৃষ্টান্ত: নিকট অতীতের একটা উদাহরণে বলা যায়, জাভেদ মিয়াঁদাদের একটি ক্রিকেট খেলার ঘটনার কথা। শারজায় অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলেশিয়া কাফ ক্রিকেট খেলার ফাইনালে জাভেদ মিয়াঁদাদের ওই খেলার ঘটনার কথা অলৌকিক-ই বলা যায়। কেননা অনেক সময় পঞ্চাশ ওভার খেলাতেও একটা ছক্কা হয় না। কিন্তু ওই দিন একটি বল ছিল যা থেকে চার মারলেও পাকিস্তান হেড়ে যেতো, আর যদি ছক্কা মারাতে পারে তবে জিততে পারবে ব্যাপারটা ছিল এতবড় প্রত্যাশা। সকলে তাকিয়ে ছিল মাঠে জাভেদ মিয়াঁদাদের দিকে। যারা সেই সময় পাকিস্তানের সাপোর্টার ছিল তাদেরতো মনে হয় উত্তেজনায় হার্ট বিটও বেড়ে গিয়েছিল। ফলতঃ মিয়াঁদাদ ছক্ক-ই মেরেছিল। ওই ঘটনাটাকে অলৌকিক বললে মনে হয় না বাড়িয়ে বলা হবে। কেননা রোমাঞ্চকর ওই ঘটনা মিয়াঁদাদকে আখ্যানে চিরস্থায়ী জায়গা করে দিয়েছিল। ওই খেলায় তাকে বসিয়েছিল বীরত্বের আসনে। ওই রকম এক আখ্যানে ২ মার্চ ২০১৪ এশিয়া কাপ ক্রিকেটে শহীদ আফ্রিদিকে স্বপ্নের নায়ক বানিয়ে দিয়েছে। ওই দিনের ঘটনাটা মনে হয় মিয়াঁদাদের চেয়েও বেশি কাঙ্খিত আর আরা বড় অলৌকিকত্ব দান করেছে আফ্রিদিকে। মনে হয় আগমী অনেক অনেক দিন বা কয়েক দশক ওমন ঘটনা ঘটবে কিনা সন্দেহ আছে। কেননা চার বলে দশ পাওয়া আফ্রিদির ঘটনা মিয়াঁদের চেয়েও বড় আর বিরল। আগের ক্রিকেট ইতিহাসে একমাত্র মিয়াঁদাদ ছিল, এবার তার সাথে আরো বড় করে যোগ হলো আফ্রিদি। আফ্রিদি জানতো দুই বলে দুই ছক্কা মরলেই কেবল তার দল জিতবে। যাদের বর্তমান যুগের ক্রিকেট সম্পর্কে সামান্য ধারনা আছে, তারাই বলতে পারবে ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা মানেই বাড়তি এক উত্তেজনা। ওই উত্তেজনার মধ্যেও আফ্রিদি ‘মিয়াঁদাদ কীর্তি’ গড়লেন, ক্রিকেট ইতিহাসে হয়তো এমন অলৌকিক ঘটানা আর বহু দিন ঘটবে না।

বাংলাদেশের বিখ্যাত দু’একজন ব্যক্তিত্বের মধ্যে শেখ হাসিনা যে একজন হবেন, এতে কোন সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না। সেই শেখ হাসিনা যে বেঁচে আছেন (কথাটা খুবই অপ্রিয়), তা যে অনেকটাই অলৌকিকভাবে তা কি যুক্তিবাদী বা বাস্তববদী বা বস্তুবাদীরা মেনে নেবেন। তাঁর জীবনের এমন দু’একটা উদাহরণ স্মরণ করলে, তা বস্তুবাদীরা কিভাবে গ্রহণ করবেন-বলা মুশকিল। যেমন এক: এরশাদ আমলে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। কে একজন নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে দ্রুত শেখ হাসিনাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে তাঁর (শেখ হাসিনা) প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। দুই: যদি গ্রেনেড হামলার কথা বলা হয়, তাও একটা বড় দৃষ্টান্ত হিসেবেই চিহ্নত করা যায়। কারণ ওই হামলায় বেশ কয়েকটি গ্রেনেড ছুড়া হয়েছিল। কিন্তু যে গ্রেনেডটা শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে ছুড়া হয়েছিল, সেই গ্রেনেডটাই বিস্ফারিত হয়নি। অথচ শেখ হসিনা-ই ছিল মূল টার্গেট। অন্যদিকে গ্রেনেডগুলিও ছিল অত্যাধুনিক এবং যারা ছুড়েছিল নিঃসন্দেহে তারাও কম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল না। যার উদ্দেশ্যে ওই গ্রেনেড ছুড়া হয়েছিল তিনিই বেঁচে গিয়েছিলেন কিন্তু ওই হামলায় প্রাণ দিয়েছিলেন অনেকেই। ব্যাপারটাকে যদি miracle বা অলৌকিক বলা হয় তবে মনে হয় না কম বলা হবে। এরকম আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখতে বা শুনতে পাই ওমুকে অলৌকিকভাবে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু অলৌকিকত্বকে আমরা তেমন গুরত্ব দিয়ে ভাবি না। মনে করি এটা একটা কথার কথা।

২৫ জুলাই ২০১৩ সালের একটা ঘটনা: আড়াইহাজারের জরিনা বেগমের। তাঁকে স্থানীয় চিকিৎসকরা রেফার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছিল কারণ তাঁর অবস্থা ছিল বেশ বাড়া বাড়ি রকমের। সেখান থেকে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত নিশ্চিত করে ঘষণা করেন। যথারীতি তাকে বাড়িতে আনা হয় এবং দাফনের আয়োজন ও আরাম্ভ হয়। হঠাৎ করে দেখা গেল জরিনা বেগম বেঁচে আছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন আসলেও তিনি মারা গিয়েছিলেন কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে উঠেছেন। মৃত থেকে জীবন পাওয়ার ব্যাপারটা হয়তো অনেকেই  বিশ্বাস করবেন না। বলবেন, ‘বাংলাদেশের চিকিৎসকতো! ‘ভাল করে পরীক্ষা না করেই হয়তো বলে দিয়েছেন মারা গেছে’! তবে সবদিকে বিবেচনা করলে বলা-ই যায়, ঘটনাটা ব্যাতিক্রম বা অলৌকিক!

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের হয়তো দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে পার পাওয়া যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির ডাক্তরদের অতো সহজে দায়িত্বজ্ঞানহীন বা কান্ডজ্ঞানহী বলে পার পাওয়া যাবে না। ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সালে ঘটেছে মিসিসিপির ওয়ালটার নামের ৭৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তিকে নিয়ে একটি ঘটনা-যাকে নাম দেয়া হয়েছে ‘মিরাকল পারসন’। ওয়ালটারের চিকিৎসক ডেক্সটার হাওয়ার্ড নিশ্চিত করেছিলেন, তিনি (ওয়ালটার) বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু বরণ করেছেন। তারপর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ওয়ালটারের লাশ প্রস্তুত করাও শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে মৃতদেহ সাজানোর জন্য পেশাদার কর্মী পাওয়া যায়। ওয়ালটারের মৃতদেহ সাজাতে যেয়ে কর্মীরা লক্ষ করলেন ওয়ালটার নিঃশ্বাস ফেলছেন। এ বিষয়ে চিকিৎসক ডেক্সটর হাওয়ার্ড জানান, খুব সম্ভব ওয়ালটারের পেসমেকার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজে নিজে সেটা চালু হওয়ার পরই শ্বাস-প্রশ্বাস শুরু হয় তার।

এই রকম মৃত্যুর (?) পর ফিরে আসার ঘটনা খুজলে অারো অনেক পাওয়া যাবে যেমন:  ভারতের মাগান কানওয়ার, যুক্তরাষ্ট্রের টনি ইয়াহুল। এমন আরও অনেকেই ফিরে এসেছেন সাক্ষাৎ যমের হাত থেকে। মাগানকে তো চিতায় পর্যন্ত ওঠানো হয়েছিল। এছাড়া ফাঁসি দেয়ার পর মৃত্যু হয়েছিল মাদক চোরাকারবারি আলী রেজার। তিনিও ফিরেছিলেন না ফেরার দেশ থেকে। ঘটনাগুলো যে সাধারণ ঘটনা নয় বলা যায় অলৌকিক, তা বলার অপেক্ষ রাখে না।

শাহ্ জালাল (রাঃ) জীবন নিয়ে আলোচনা করলে অনেক অলৌকিক ঘটনা পাওয়া যাবে। তবে অতো বড় আলোচনার সুযোগ এখানে নেই, একট ঘটনা দিয়ে শেষ করতে চাই। সৈয়দ নসির উদ্দীন (রাঃ) যিনি শাহ্ জালাল (রাঃ) এর সাথে বাংলাদেশের সিলেটে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন তিন’শ ষাট জন আওলিয়ার অন্যতম একজন। তিনি মৃত্যুর পূর্বে নসিয়ত বা ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তার কবর যেন পূর্ব আর পশ্চিম দিকে দফন করা হয়।

ওই সময়ের আলেম সমাজের আপত্তির মুখে নসির উদ্দীন (রাঃ) এর অসিয়ত কোনভাবেই কর্যকারী করা সম্ভব হয়নি। শরিয়তের আইন বা নিয়ম অনুযায়ি উত্তর দক্ষিণেই তাঁর দাফন সম্পূন্ন করা হয়েছিল। দাফন শেষে শরিয়তপহ্নি এবং তার ভক্তবৃন্দ চল্লিশ পা ব্যবধান পার হতেই এক প্রকন্ড শব্দ শুনে পিছন ফিরে দেখেন, নসির উদ্দীন (রাঃ) এর কবর বা মাজার পূর্ব পশ্চিম মুখে ঘুরে গেছে। এর পর শরিয়তপহ্নিরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রর্থনা করেন। সাড়া পৃথিবীর যতো মুসলমানের কবর আছে তা সবই উত্তর দক্ষিণে মুখ করা। কিন্তু শুধু একটি মাত্র কবর বা মাজার পূর্ব পশ্চিমে মুখ করে আজো পর্যন্ত বিদ্যমান থেকে কোন অলৌকিকত্বের প্রমান করছে তা একমাত্র স্রোষ্টাই বলতে পারবেন।

মার্চ ৪, ২০১৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *