অভিবাসন

 

মীর আখতার হোসেন নাজরুল: ইউরোপের অভিবাসন সঙ্কট মোকাবেলায় তুরস্কের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছেন ইউরোপীয় নেতারা। এই বছরই প্রায় ৬লাখ অভিবাসী সমুদ্রপথে ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রবেশ করেছে। তুরস্ক প্রায় ২০ লাখ এবং সৌদি আরব ও অনুরূপ সংখ্যাক অভিবাসীকে জায়গা দিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধপীড়িত প্রতিবেশী দেশ সিরিয়া থেকে আসা। ফলে ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের বৈঠেক মূল ফোকাস হযে উঠতে যাচ্ছে তুরস্ক।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এক্ষেত্রে তুরস্ককে ‘মূল ভূমিকা’ নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ১৫-১০-২০১৫ তারিখে জার্মানির পার্লামেন্টে তিনি বলেছেন, যুদ্ধপীড়িত দেশ থেকে আসা বেশিরভাগ শরণার্থী তুরস্ক হয়ে ইউরোপে ঢুকছে। তুরস্কের ভূমিকা ছাড়া শরণার্থী সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ইউরোপের ২৮ জন নেতার বৈঠকে ব্রাসেলসে একটি যৌথ কর্ম পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার ব্যাপারে আশা করা হচ্ছে। এতে যেসব বিষয় থাকতে পারে তার মধ্যে আছে, তুরস্কের অভিবাসী সংকট মোকাবেলায় বৃহত্তর আর্থিক ও পদ্ধতিগত সহায়তা, তুরস্কের উপকূলে টহল দেয়ার অনুমতি, মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই, অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে জোরদার কর্মসূচি ইত্যাদি ইত্যাদি।

ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সমুদ্রপথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সুবাদে পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, ডেনমার্ক ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে ভাগ্যান্বেষী প্রচুর লোক ভারতবর্ষে (বাংলায়) এসে ব্যবসা চালু করে। তাদের অনেকে বাংলার বিভিন্ন এলাকায় কুঠি প্রতিষ্ঠা করে। তখন অভিবাসন নিয়ে ছিল না কোন নিষ্ঠুর নিয়তি বা ফলাফল। বরং ভালভাবেই বা সুবিধা মতই ওই সব মানুষ (ইউরোপিয়) নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারত। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে অভিবাসী সমস্যা চরম রূপ নিয়েছে। এর কারণ যেন বিশেষ করে অগ্নিতে ঘি ঢালা হয়েছে সিরিয়ার রাজনৈতিক সংকট। এর উপর আছে মানুষের কজের অন্বেষণ, বর্তমান আর্থিক দৈন্যতা থেকে আর একটু ভাল অবস্থায় যাওয়ার প্রচেষ্টার সুযোগে মানব পাচারকারীরা খেলছে মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া। এ অবস্থায় লাখ লাখ মানুষ জীবনের ঝুঁকির মধ্যে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে। আবিস্কার হচ্ছে গণকবর, না হয় সমুদ্রে ভেসে যাওয়া লাশের মিছিল। কোন সংসয় নেই গণকবরের মধ্যে যারা স্থান পেয়েছে বা সমুদ্রে লাশের মিছিলে শামিল হয়ে যারা ভাসছে তাঁরা ওই সব হতভাগ্য মানুষ, যারা মাথা গোঁজার ঠাই বা উন্নত কর্ম সংস্থানের খোঁজে নিয়োজিত ছিল।

আদিম শিকারী সমাজের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে ক্রমশ সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর দশ হাজার বছর আগে যখন পশ্চিম এশিয়াতে কৃষিভিত্তিক সমাজের উৎপত্তি ঘটেছিল তখন সে সংস্কৃতিও সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর ছয় সাত হাজার বছর আগে যখন মিশর ও ব্যবিলনে ব্রোঞ্জযুগের নগর সভ্যতার উদয় ঘটেছিল তখন ক্রমশ তার প্রভাবে ও অনুকরণে পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে এবং সিন্ধু অববাহিকার, চীনে ভূমধ্যসাগরের ক্রীটে বোঞ্জযুগের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। শিকারী মানুষ থেকে সভ্য মানুষ ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের মিশরীয় মেসোপটেমীয়, পারসীক, হীব্রু, হিট্টইট, ফ্রিজীয়, লিডয়, ফিনিশীয়, ক্রীটার, গ্রীসীয় রোমক, ভরতীয়, চৈনিক, কোরীয়, জাপানী মায়া, অজটেক, ইনকা প্রভৃতি সভ্যতার মানুষ অভিবাসী হয়েই চলেছে। তাই বলা যায় অভিবাসন কোন নতুন কথা নয়। লাখ লাখ বছর ধরেই অভিবাসন হয়ে আসছে। তবে রূপ আর পরিভাষা হয়তো পাল্টিয়েছে।

বর্তমান পৃথিবীর আয়তনের দিক থেকে প্রথম ৫টি দেশের অবস্থা: রাশিয়া (Russia) আয়তন: ১,৭০,৭৫,৮০০ বর্গ কিমি বা ৬৫,৯২,৪০০ বর্গ মাইল (১ম) জনসংখ্যা: আনুমানিক ১৪,৩০,৩০,০০০ জন (৮ম) কানাডা (Canada) আয়তন: ৯৯,৮৪,৬৭০ বর্গ কিমি বা ৩৪,৫৪,০৮২ বর্গ মাইল (২য়) জনসংখ্যা: ৩,৪৭,৭৭,০০০ জন (৩৫ তম)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States of America) আয়তন: ৯৬,৩১,৪১৮ বর্গ কিমি বা ৩৭,১৭,৭২৭ বর্গ মাইল (৩য়) জনসংখ্যা: আনুমানিক ৩১,২৩,৫৩,০০০ জন(৩য়)। গণচীন (China) আয়তনঃ ৯৫,৯৬,৯৬০ বর্গ কিমি বা ৩৭,০৪,৪২৬ বর্গ মাইল (৪র্থ) জনসংখ্যাঃ আনুমানিক ১৩৩,৮৬,১২,৯৬৪ জন (১ম)।ব্রাজিলঃ (Brazil) আয়তনঃ ৮৫,১১,৯৬৫ বর্গ কিমি বা ৩২,৮৫,৬১৮ বর্গ মাইল (৫ম) জনসংখ্যাঃ ১৯,০৭,৩২,৬৯৪ জন (৫ম)

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব প্রায় এক হাজার দুশোর কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যদি কেবল উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে ঠেসে দেয়া হয় তাহলে সেখানকার জনঘনত্ব যা দাঁড়াবে, বাংলাদেশের বর্তমান জনঘনত্ব এখন তাই। অনেকের কাছে এটাই আঁতকে উঠার মতো পরিসংখ্যান। কিন্তু ধরা যাক, অর্ধেক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের তিরিশ কোটি মানুষের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো উইসকনসিনে। কি দাঁড়াবে অবস্থাটা ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন যে গতিতে কমছে, যতদিনে সেটা থিতু বা স্থির হবে, ততদিনে বাংলাদেশের জনঘনত্ব দাঁড়াবে অনেকটা এরকম।

বিশ্বের অনেক জাতির মতো বাঙালিরাও নানা কারণে স্বদেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ, পার্শ্ববর্তী মহাদেশ, এমনকি দূরবর্তী পাশ্চাত্য দেশগুলিতে গিয়ে বসবাস করছে। বাঙালিদের দেশত্যাগী হবার ইতিবৃত্ত অনেক পুরানো। ১৮০১ সালের ব্রিটিশ আদমশুমারি অনুযায়ী ইংল্যান্ডে বাঙালি আয়া ও গৃহভৃত্যের সংখ্যা ছিল ৫০,০০০। বাংলা থেকে অন্যত্র অভিবাসন উনিশ শতকের শেষের দিক থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে থাকে। ১৮৬০-এর পর থেকে এতদঞ্চলে ঘন ঘন দুর্ভিক্ষ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার বাংলার উদ্বৃত্ত শ্রমিক বিশ্বের শ্রমিক-ঘাটতি এলাকায় স্থানান্তরের কথা ভাবতে শুরু করে। ১৮৭৪ সালে সরকার বাংলার ভূমিহীন কৃষকদের আসাম ও বার্মায় নিয়ে সেখানকার অকর্ষিত ভূমি আবাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশের যত লোক বিদেশে কর্মরত ছিল তাদের প্রায় ৬৫% অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক, ৬% নির্মাণ শ্রমিক, ৬% গাড়িচালক, ৮% টেকনিশিয়ান, ৫% ক্যাটারিং শ্রমিক এবং ১০% প্রকৌশলি, চিকিৎসক, শিক্ষক ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী। ২০১০ সাল নাগাদ বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি জনশক্তির কাঠামোতে নিরঙ্কুশ ও আনুপাতিক উভয় বিচারেই শ্রমিকদের অংশ অনেক বৃদ্ধি পায়। এ সময় বিদেশে অভিবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে মাত্র ২.৫৪ শতাংশ ছিলেন বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী, ৩০.২৪ শতাংশ দক্ষ শ্রমিক, ১৪.৫৯ শতাংশ আধা-দক্ষ শ্রমিক আর ৫২.৬৩ শতাংশ অদক্ষ শ্রমিক।

মনুষের বসবাস এ পৃথিবীতে যখন থেকে শুরু হয়েছে তখন যে যেখানে পেরেছে সেখানেই থিতু হয়েছে। যখন মানুষ কম ছিল তখন স্থানের কোন গুরত্ব ছিল না। অঢেল ভূমি ব্যবহারের লোক ছিল না। তাই অভিবাসন নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না। এখন দাঁড়িয়েছে ঠিক তার উল্টো। ইউরোপের দেশেগুলো নিজেদের দেশের সীমানা পাহারায় যমের মতো ব্যবহার করছে অন্য জাতির মানুষের সাথে। অথচ এখনও রাশিয়া, কানাডা, আমেরিকা ও ব্রাজিলে যে জায়গা অব্যহৃত হয়ে পড়ে আছে সেখানে যদি যেকোন দেশের  মানুষ মাথা গোঁজার ঠাই পায় এবং জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তবে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। তাই সভ্যতার প্রয়োজনে এখন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চিন্তা ভাবনা নতুন করে করতে হবে। নিজেস্ব জাতীয়তার স্বার্থে মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি অমানবিক আচরণ করা থেকে বিরত হতে হবে। তা হলেই হয়তো মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বর্তমান অভিবাসন সমস্যা দুর হবে। এবং বহু মানুষ পাবে নিরাপত্তা, কর্ম সংস্থান ও মানুষ হয়ে বাঁচার সার্থকতা।

অক্টোবর ১৬, ২০১৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *