অনিদ্রা

 

মীর আখতার হোসেন নজরুল: ঘুম না আসার কষ্ট ভুক্তভোগীরা বোঝেন। সারা রাত বিছানায় ছটফট, চোখের নিচে কালি, স্বাস্থ্যহীনতা এ এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। বেশির ভাগ লোকের মুখেই শোনা যায় ‘ঠিকমতো ঘুম হয় না।’ চল্লিশোর্ধ্ব রোগীরা তো প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন, আমি অনিদ্রায় ভুগছি। অনিদ্রার সংজ্ঞা কী? চোখে ঘুম না আসা মানেই কি অনিদ্রা? স্বাভাবিক ঘুমের সময় হলো মোটামুটিভাবে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। কিন্তু পরিবেশগত বা হঠাৎ মানসিক চাপের কারণে ঘুম না-ও আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাকে অনিদ্রা আখ্যায়িত করা যাবে না। অনিদ্রা হলো একটি বিষয়কেন্দ্রিক সমস্যা যেখানে স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর যাবতীয় অনুকূল পরিবেশ ও ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ঘুমাতে যাওয়ার পর ঘুম না আসা কিংবা ঘুমিয়ে পড়লে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে যাওয়া অথবা ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়া। দু-তিন দিন এ রকম উপসর্গ দেখা দিলে তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু সপ্তাহ খানেকের বেশি এ সমস্যা স্থায়ী হয়ে থাকলে তাকে অনিদ্রা বলে।

তিন ধরনের অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া রয়েছে।  অনিদ্রার কারণ: এক. ব্যথায় মানুষের মস্তিষ্কের উত্তেজক কেন্দ্রে সর্বদা উত্তেজনা সৃষ্টি করলে; রোগীর ঘুম হয় না। দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার অসুখগুলো যেমন আর্থ্রাইটিস, আলসার, মাথাব্যথা, এনজিনা প্রভৃতি কারণে রোগী অনিদ্রায় ভোগে।

দুই. অনিদ্রার জন্য সবচেয়ে বেশি যে কারণটিকে দায়ী করা হয়, তা হলো মানসিক কারণ। পারিবারিক জটিলতা, দাম্পত্য কলহ, অর্থনৈতিক সমস্যা, স্থান বা কাজের পরিবর্তন, বেকারত্ব, যৌন অতৃপ্তি, কল্পনার সাথে বাস্তবের অসঙ্গতি, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা প্রভৃতি কারণ অনিদ্রার জন্য দায়ী। এ ছাড়া সিজোফ্রেনিয়ার এবং বিভিন্ন মানসিক রোগের রোগীরা অনিদ্রায় ভোগে।

তিন. অভ্যাস এবং পরিবেশগত কারণে ঘুমের বিঘ্ন ঘটে। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে না যাওয়া, দিবানিদ্রা যাওয়া, রাতে বেশি মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া, কোলাহলপূর্ণ ঘরে থাকা, বেশি আলো, অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা ঘরে অবস্থান করা অনিদ্রার অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে, ঘুমের কোন সুনির্দ্দিষ্ট সংজ্ঞা (Definition) এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা স্থির করতে পারেনি। অর্থাৎ ঘুম কি তা আমরা এখনো সম্পূর্ণরূপে জানিনা। এজন্য কোন এক দার্শনিক ব্যাঙ্গ করেই হোক আর ঘুম সম্পর্কে অজ্ঞতার জন্যই হোক-বলেছেন, “আমরা জেগে আছি তাই ঘুমাই।” তবে বিজ্ঞানীরা মোটা মুটিভাবে দাবি করছেন: ঘুম মূলত অক্সিজেন ও ক্রোমাতোফাইলের অভাব এবং কার্বনিক গ্যাসের বাহুল্য থেকে হয়ে থাকে। যদিও এই থিওরির বিপরীতেও কম যুক্তি আসেনি।

বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট হলো, কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত বা ফলাফল বার বার একই হয়ে থাকে। অর্থাৎ দুই আর দুই যোগ করলে চার হয়-এটা সব সময়ই এক থাকে। কিন্তু ঘুম সম্পর্কে আজ পর্যন্ত যা জানা গেছে তা ওই দুই আর দুই-এর ফলাফলের মতো হয়নি। ঘুমের সংজ্ঞা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যতো তর্কই থাক; ঘুম সম্পর্কে এটুকু বালা যায় যে, ঘুমের কয়েকটি স্তর আছে। এই কয়েকটি স্তর পার হতে পারলেই ঘুম সম্পূর্ণতা পায়। ঘুমের ওই স্তরগুলো পার হতে কারো ৭-৮ ঘন্টা বা আরো বেশি সময় প্রয়োজন হয়। করো ঘুম ৪-৫ ঘন্ট বা আরো কম সময়েই সম্পূর্ণ হয়। আবার এমন পরিসংখ্যান ও আছে যে, কেউ কেউ মাত্র ২-৩ মিনিটের মধ্যেই ঘুমের সমস্ত স্তর পার হয়ে পরিপূর্ণ ঘুমের স্বাদ গ্রহন করতে পারে। এরিষ্টেটোল, সম্রাট নেপোলিয়ান প্রভৃতির জীবনে আমরা এমনটি-ই দেখতে পাই। ঘুমের এইসব রেকোর্ড দেখে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীগণ বিষ্মিত হয়েছেন। তাই আজ পর্যন্ত ঘুমের সুর্নিদৃষ্ট সংজ্ঞায় কেউ পৌছাতে পারেননি। আর এজন্যই আল্লা বেলেছেন, “জ্ঞান ভান্ডারের সামন্য অংশ তোমাদের দেয়া হয়েছে।” ঘুম সম্পর্কে আল্লা সহজ-সরল ভাষায় কুরআনে বলেছেন, “আমি তোমাদিগকে রাত্রি দিয়েছি বিশ্রামের (ঘুমের) জন্য।” তাই এক্ষেত্রে বলা যায়, কে কত সময় ঘুমাল ব্যাপারটা আপেক্ষিক মাত্র। যেহেতু কোন মানুষই কারো মতো নয়-মানুষ সবাই তার নিজের মতো। তাই কে কতক্ষণে ঘুম পরিপূর্ণ করতে পারল-তা বড় কথা নয়। আর এটাই নিদ্রা সম্পর্কে আধুনিক যুগের মোটা-মুটি ধারণা।

অনিদ্রার ফল: অনিদ্রা মানুষের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে। খিটখিটে মেজাজ, হঠাৎ রেগে যাওয়া, কোনো কাজে মন বসাতে না পারা, অস্থিরতা, বিষণ্ণতা, অল্প কাজে ক্লান্তি অনুভব করা, ঝিমানো, হাত-পা কাঁপা, শরীরের ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামান্দা, যৌনক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া প্রভৃতি উপসর্গ অনিদ্রার কারণে সৃষ্টি হয়। গত ১৮ মার্চে প্রকাশিত পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের প্রিলিম্যান স্কুলের নিওরো সাইন্সের আধুনিক এক গবেষণায় দেখা গেছে ক্রমাগত অনিদ্রা স্নায়ুতন্ত্রের ধ্বংস পর্যন্ত ঘটাতে পারে। প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক ডা. নেদারগার্ড দেখিয়েছেন অনিদ্রায় নিওরোটকসিনের অপচয়ে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

আমাদের ঘুমের শারিরীক সমস্যার চেয়ে মানসিক সমস্যার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। কারণ শারীরিক সমস্যা আমরা বুঝতে পারি আর তা সঠিক ঔষধ সেবনে তারা তারিই আরগ্যও হতে পারে। কিন্তু মানসিক সমস্যা বেশ জটিল। প্রায় ক্ষেত্রেই আমরা বুঝতে পারিনা আমাদের মানসিক সমস্যার কারণগুলো। এক্ষেত্রে পারিবারিক জটিলতা যাতে বৃদ্ধি পেয়ে মনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। দাম্পত্য জীবনে সবসময়ই কম্প্রমাইজ করতে হবে। অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য বাস্তবমুখি পদক্ষেপ নিতে হবে। কোন অবস্থায়ই হাল ছাড়লে চলবে না। একদিকে না হলে আরেকদিকে নজর দিতে হবে-মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক উন্নতির পথ কোন না কোনদিকে বের হয়েই থাকে। পরিসংখ্যনে দেখা যায় পৃথিবীতে যতো মানুষ অর্থনৈতিক দিকে উপরে ওঠেছে তারা প্রায় সকলে জিরো থেকে হিরো হয়েছে। একথাটা সবসময় মনে রাখতে পারলে আত্মবিশ্বাস বাড়তে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, নানান দিক থেকে অনেকেই কল্পনার রাজ্যে বাস করতে ভালবাসেন। কারণ কল্পনাতে বাধা দেয়ার কেউ থাকে না। এনকি নিজেই নিজের কল্পনা থামাতে পারে না। লাগাম ছাড়া ঘোড়ার মতো কল্পনা পেয়ে বসে। এ অবস্থায় কল্পনা আর বাস্তবতার বিরাট ব্যাবধানের জন্য মানুষ হয়ে পরে অনেকটাই অস্বাভাবিক। বাস্তবের অসঙ্গতি, দুশ্চিন্তা আর ব্যর্থতার জন্য হতাশা পেয়ে বসলে পরবর্তিতে তা বিষণ্ণতায় রূপ নিতে পারে। এসব কিছুরই আলাদা আলাদাভাবে হলেও মোকাবেলা করতে হবে। নিজে না পারলে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।

অক্টোবর ৩০, ২০১৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *